রবিবার  ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং  |  ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ২৩শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

শ্রী রাধারমণ বাংলার সহজিয়া সাধক, বিনম্র শ্রদ্ধা!

শ্রী রাধারমণ জন্মদিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা! বাংলার সহজিয়া সাধক

বাঙালী সংস্কৃতির সুমহান ঐতিহ্যের ধারক হয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যে নামটি রত্নখচিত হয়ে আছে তিনি মহাত্মা শ্রী রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ। কিছু ছেঁদো গবেষণা থেকে যতদূর জানা যায়, ১০৪৯ খ্রীস্টাব্দে মহারাজা নয়পালের সময়ে রাধারমণের পূর্বপুরুষ বিখ্যাত চিকিৎসক ভিষগাচার্য চক্রপাণি দত্ত বীরভূমের সপ্তগ্রাম থেকে শ্রীহট্ট রাজ গোবিন্দকেশব দত্তের চিকিৎসার্থে তৎকালীন শ্রীহট্টে আগমন করেন। চিকিৎসাকার্য শেষে রাজা গোবিন্দকেশব কর্তৃক শ্রীহাটে স্থায়ীভাবে বসবাস করার শত অনুরোধ সত্ত্বেও চক্রপাণি দত্ত জন্মভূমি বীরভূমে প্রস্থান করেন এবং রাজার সম্মান রক্ষার্থে দুপুত্র মহীপতি দত্ত এবং মুকুন্দ দত্তকে সিলেটে রেখে যান। চক্রপাণি দত্ত ‍“চক্রদত্তনামক”, “শব্দচন্দ্রিকা”, “দ্রব্যগুণ সংগ্রহ” এবং “চিকিৎসা সংগ্রহ” নামে চারটি বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা। এছাড়াও “আয়ুর্বেদ দীপিকা” ও “ভানুমতী” নামে চরক ও সুশ্রুতের উপর দুখানি টীকাভাষ্যেরও রচয়িতা তিনি। চক্রপাণি দত্তের পিতা নারায়ণ দত্ত মহারাজ জয়পাল দেবের “রসবত্যধিকারী” এবং পিতামহ নরহরি দত্ত দশম শতাব্দীতে মহারাজ মহীপাল দেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। “রস ষড়্‌বিংশতি গুণের অন্যতম। মধুর অম্ল লবণ কটু কষায় তিক্ত ভেদে তা ষড়্‌বিধ। জলে ও পৃথিবীতে রস বিদ্যমান। যা পঞ্চ তন্মাত্রের একতম। এই ষড়্‌বিধ রস পরস্পর সংযোগে সপ্তপঞ্চাশৎপ্রকার।” চক্রপাণি দত্ত কর্তৃক প্রণীত টীকাভাষ্যে রস সম্পর্কে এরূপ তত্ত্বাদি পাওয়া যায়। পরবর্তীতে মহীপতি দত্তের উত্তর পুরুষ প্রভাকর দত্ত ও কেশব দত্তের বংশীয় উত্তরাধিকার শ্রী রাধামাধব দত্তের ঔরষে ও শ্রীমতি সুবর্ণা দেবীর গর্ভে ১৮৩৪ খ্রীস্টাব্দে বৃহত্তর শ্রীহট্ট অধুনা সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার কেশবপুর গ্রামে আবির্ভূত হন রাধারমণ দত্ত এবং ১৯১৫তে লোকান্তরিত হন। এবিষয়ে আমাদের মননের দীনতা ও নীচতা এতটাই প্রসারিত যে, মাত্র ১৭৬ বছর আগে আবির্ভূত এই মহাপুরুষের জন্ম-মৃত্যু ও জীবনকাল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ কোনো ধারণা আমরা অদ্যাবধি পাই না। কুতর্কপ্রিয় ও পরশ্রীকাতর বাঙালী সত্যিই ইতিহাস বিস্মৃত জাত!

বৈষ্ণব-সহজিয়া দর্শনে দীক্ষিত রাধারমণের পিতৃদেব রাধামাধব দত্ত ছিলেন বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত। ফলে পারিবারিক আবহে লালিত রাধারমণের শৈশব ও বাল্যকালেই বৈষ্ণব-সহজিয়া দর্শনের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মে। রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় “ভারত সাবিত্রী” ও “ভ্রমরগীতা” এবং মহাকবি জয়দেবের “গীতগোবিন্দ” কাব্যের স-ছন্দ টীকাভাষ্য রচনা করেন। এছাড়াও তাঁর বাংলা ভাষায় রচিত গ্রন্থ “পদ্মাপুরাণ”, “সূর্যব্রত পাঁচালী”, “গোবিন্দ ভোগের গান” এবং “কৃষ্ণলীলা কাব্য” অন্যতম। রাধারমণের যখন মাত্র ৯ বছর তখন তাঁর মহৎ হৃদয়বান পিতৃদেব লোকান্তরিত হন। এরপর ৩৪ বছর বয়সে ১৮৬৮তে তিনি গুণময়ী দেবীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। প্রায় ৮১ বছরের জীবনকালে মহাত্মা রাধারমণ দত্ত মানবপ্রেমের নিদর্শন স্বরূপ যেসব সৃষ্টিকর্ম রেখে গেছেন তা বিশ্ব সাহিত্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার হিসেবে বিবেচ্য।

কৈশোরকাল থেকেই রাধারমণ ছিলেন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তত্ত্ব জিজ্ঞাসু। বাঙালী জীবনে চর্চিত সকল দর্শনই যেমন- শাক্ত, শৈব, সহজিয়া ও বৈষ্ণব বিভিন্ন মতবাদ তিনি অধ্যয়ন ও নিজ জীবনে প্রয়োগ করেন। তত্ত্ব ও অনুশীলনের এই নিবিড় চর্চা সাধক রাধারমণের জীবন দৃষ্টিভঙ্গীতে যে একত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম দেয় তা প্রতিফলিত হয় তাঁর গীতি-কবিতা ও সুরে। জীবনে তত্ত্ব ও কর্মের এই গভীর একত্ববোধ রাধারমণের মনন ও মনুষ্যত্ববোধ গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তাঁর গানে তথা সুরে এবং কথায় যে অখণ্ড ঐকনিনাদ ধ্বনিত হয় তা যেনো তাঁর নিজ জীবনে চর্চিত সাধনার সুনিয়মিত প্রকাশ। চারিত্র-বৈশিষ্ট্যে মানবিক গুণের গভীর অনুশীলনের মধ্যদিয়ে তিনি নিছক ব্যক্তিক অবস্থানকে নাকচ করে নিজকে উন্নীত করেন সামষ্টিক অবস্থানে- অর্থাৎ একক থেকে সমগ্রে, বিশেষ থেকে সাধারণে। লোকায়ত দর্শন চর্চায় নিজকে সাধনমার্গের এমন পর্যায়ে উন্নীত করেন যেখানে সর্বসাধারণের দুঃখ-বেদনা-বিরহকে নিজ প্রপঞ্চে ধারণ করে তা স্ব-কণ্ঠে স্বভাব কবির মতো কথা ও সুরে প্রকাশ করার মধ্যদিয়ে কেবলমাত্র নিজকেই সুশোভিত করেন না- উপরন্তু, রাধারমণ হয়ে ওঠেন বড়ু চণ্ডীদাসের বিকশিত, বর্ধিত ও পূর্ববঙ্গীয় লোকজ রূপ। প্রকৃত অর্থেই হয়ে ওঠেন চিরায়ত বাংলার আত্মা এবং একজন পরিপূর্ণ দার্শনিক-কবি।

সংসার ধর্ম পালন করে সনাতনী জীবন-দর্শনের নিগূঢ়ে নিজকে আবদ্ধ রেখে চতুরাশ্রম প্রথা, তথা- ব্রক্ষ্মাচর্যাশ্রম, গার্হস্থ্যশ্রম, বাণপ্রস্থাশ্রম ও সন্ন্যাসকে তিনি পর্যায়ক্রমে পালন করেছেন। নিজ জীবনে এসব কঠোর অনুশীলন ও তপস্যায় ব্যাপৃত থেকেও মানব মনের গহীনে অনুরণিত জটিল ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভবকে হৃদয়-মনন দিয়ে উপলব্ধি করে কোমল-পেলব গীতিময়তায় প্রকাশ করেছেন। ভাটিবাংলার জনপদের প্রকৃতি ও মানুষের নিরন্তর দ্বন্দ্বমূলক সংগ্রামের মিথস্ক্রিয়ায় হাওড়ের জলতরঙ্গের অভিঘাতে তরঙ্গায়িত জীবনের সুখ-দুঃখ প্রতিফলিত ও প্রকাশিত হয়েছে রাধারমণের গীতিকবিতায়। জীবনের এ-এক অখণ্ড নিনাদ। যা ধ্বনিত আর চর্চিত বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোণা, উত্তর ও পশ্চিম ত্রিপুরা, বরাক উপত্যকা, সুনামগঞ্জের সন্নিহিত মেঘালয় এবং আসাম ও কাছাড়ের বিস্তীর্ণ জনপদে। জনজীবনের গভীরে ওৎপ্রোতভাবে মিশে আছে রাধারমণের মহান কীর্তি। তাঁর গান গীত হয় সর্বসাধারণে। পালা পার্বণ, লোক উৎসব, বিবাহ উৎসব, জন্মোৎসবের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর গান নারী এবং পুরুষ কণ্ঠে অথবা সমবেত কণ্ঠে গীত হয়। তাঁর গানে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-মিলন, জয়-পরাজয়, বঞ্চনা-প্রাপ্তি এমনভাবে মূর্তমান যে, সেই ভাবৈশ্বর্যের আবেশে যে কোন শ্রোতাই মোহমুগ্ধ হতে বাধ্য। কৃষি কর্মে নিযুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কৃষি শ্রমিক, মাঝি-মাল্লা ও শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠে রাধারমণ পরম আরাধ্য। বিশেষ করে শ্রীহট্ট বা কাছাড়ের নানাবিধ পারিবারিক উৎসবে ধামাইল নৃত্যের তালে তালে মেয়েরা যাঁর গান অপার আগ্রহের সঙ্গে গেয়ে থাকে তাঁরই নাম ভাই রাধারমণ। রাধারমণের গান ধামাইল নৃত্যে বহুল প্রচলিত। ধামাইল সিলেট ও বরাক অঞ্চলের নিজস্ব লোকসংস্কৃতির বিশেষ রূপ যা অঙ্গভঙ্গী সহযোগে নৃত্যগীতে প্রকাশিত। অধুনা ধামাইল নৃত্যগীত বলতে রাধারমণের গানকেই বোঝায়।

রাধারমণের জীবনকালে সমগ্র বাংলায় চলছিল সামাজিক জাগরণ-পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক পালাবদল। যা কিছু পুরাতন-জীর্ণ সে অচলায়তন-আগল ভেঙে নতুনের জয়-জয়কার। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রভূমি ছিল কলকাতা। কলকাতা থেকে অনেক দূরে নিভৃত এক পল্লীতে এই মহান সাধকপুরুষ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার স্রোতের বিপরীতে বাংলার তথা ভারতবর্ষের চিরাচরিত প্রথানুযায়ী তাঁর সাধনমার্গে ব্যাপৃত ছিলেন। এখানেই তাঁর বিশিষ্টতা, একাগ্রতা আর মাহাত্ম্য নিহিত। কাগজ-কলম হাতে নিয়ে তিনি কখনোই গীত রচনা করেননি। ভক্তবৃন্দ পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি কবি-গান পরিবেশন করতেন এবং উপবিষ্ট শিষ্য-প্রশিষ্যগণ মুখে মুখে সেই গান শিখে নিতেন। এভাবেই সুদূরাতীত কাল থেকে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় যে জীবন-দর্শন চর্চার রীতি-পদ্ধতি বিকশিত হয়েছিল এই বাংলায়- সেই ঐতিহ্য অবলম্বিত, প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁর জীবনে। কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব থেকে মহাকবি বাল্মিকী, অশ্বঘোষ, ভাস, কালিদাস, শুদ্রক, ভবভূতি, বাণভট্ট হয়ে বড়ু চণ্ডীদাস এবং শ্রী চৈতন্য পর্যন্ত বহমান ধারাবাহিকতার সফল উত্তরসাধক ও মূর্তপ্রতীক রাধারমণ। সিরাজ সাঁই এবং তদীয় শিষ্য লালন ফকিরও একই পন্থায় গীত রচনা করেন।

নির্যাতিত-নিপীড়িত মেহনতী মানুষের হৃদয়-কন্দরের শুষ্ক সুপ্ত হৃদয়হীন অবস্থাকে এক মহৎ হৃদয়বান, প্রেমনির্ঝরিণী পরিপূর্ণ জাগ্রত মানবমনে উন্নীত করাই ছিল তাঁর সাধনা। তাঁর দর্শনের মর্মবাণীই হচ্ছে, “মনুষ্য জন্ম দুর্লভ। মনুষ্যকূলে জন্মগ্রহণ করে জ্ঞান লাভ না করলে জীবন-ই বৃথা।” তাই তিনি গেয়েছেন, “যদি জ্ঞান না হয় মনে, সেই জ্ঞানের ফল কিছু নাইরে।” একথা বলার মধ্যদিয়ে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বুদ্ধদেবের অমর বাণী “জ্ঞান-ই মানব ধর্ম” এই দর্শনের সঙ্গে। প্রেমের অভিলাষে গেয়েছেন, “পিরিতি শিখিলে মিলে পন্থের চলন, সেই পথে চলিলে মিলে প্রিয়া দরশন।” প্রিয়া দরশনে রাধারমণের চিত্ত তৃষ্ণার্ত ও ব্যাকুল ছিল। প্রেম সাধন শিক্ষার জন্য তিনি গুরু মুখাপেক্ষী ও গুরুর পদাশ্রয়ী। তাই তিনি গুরুর কাছে মিনতি করেছেন এই বলে, “পিরিতের অভিলাষে আশ্রিত তোমার চরণ, শিক্ষা দিয়া দীক্ষা দিয়া ভরাও শ্রী রাধারমণ।” তাঁর কাছে, মানব মন হচ্ছে তৃতীয় নয়ন” তথা ষষ্ঠেন্দ্রিয়। এখানে তিনি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে গঠিত মানবমনকেই বুঝিয়েছেন। জ্ঞানহীন, নিরক্ষর, অজ্ঞানমন, কুসংস্কারে আচ্ছাদিত মানবমনকে তিনি সর্বদাই বুঝিয়েছেন, “মনুষ্য দুর্লভ জনম, গেলেনি আর পাওয়া যায়।” নির্যাতিত-নিপীড়িত, প্রবঞ্চিত-প্রতারিত মেহনতী মানুষের পাষাণ হয়ে যাওয়া মনকে অজ্ঞানতা পরিহারপূর্বক মোহনিদ্রা ভঙ্গ করে সচেতন হওয়ার দীক্ষা দিয়ে, তাদের সমব্যথী হয়ে উচ্চকণ্ঠে গেয়েছেন, “পাষাণ মন-রে বুঝাই-ও, তুমি চিনিয়া মানুষের সঙ্গ লই-ও।” বিদ্যাপতি বা অন্যান্য বৈষ্ণব কবির মতো তাঁর পদাবলী অলঙ্কার সমৃদ্ধ নয়। বরং বলা চলে যে রাধারমণের পদ বহুলাংশে অলঙ্কার বর্জিত। পদকর্তা হিসেবে তিনি গ্রামীণ সাধারণ মানুষের ব্যক্ত কথ্য আঞ্চলিক শব্দাবলীকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। গ্রামের নিরক্ষর কৃষকের ভাষাতেই তিনি পদ রচনা করে গেয়েছেন, “তুমি রাজা, রাজা তোমার তুমি অধিকারী, তুমি ধনী তুমি মানী আমি হই ভিখারী।” দীনহীন দরিদ্র মানুষের ব্যথায় সমব্যথী হয়ে গেয়েছেন, “আগম নিগম শাস্ত্রবেদে লীলাখেলা, মোরে দিয়া সাজাইলায় পঞ্চভূতের মেলা ॥ তোমার ইচ্ছা প্রতিবাদী কেবা বলো হইলো, তোমার লাগি দীনহীনের কলঙ্ক রহিলো। ভাবিয়া চিন্তিয়া আমার অঙ্গ হইলো কালো, এ ভব সংসার হইতে মরণ ছিলো ভালো ॥” বোকা চাষীকে উদ্দেশ্য করে গেয়েছেন, “মন তোর মতো বোকা চাষী ত্রিজগতে আর দেখি না, দেহের জমি পতিত রইলো চাষাবাদ তো করলি না ॥ যমের তশীল্‌দার এসে করবে তশীল্‌ ধরে কষে, মাল গুজারি করবি কিসে সে ভাবনা তো ভাবলি না।” এরকম অনাড়ম্বর মেঠো শব্দের ব্যবহারের মধ্যদিয়ে রাধারমণের গীতে মানব মনের গভীর অনুভবের প্রকাশ বারংবার বড়ু চণ্ডীদাসের আর নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে বিকশিত-প্রস্ফুটিত বৈষ্ণব সাহিত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আত্মদর্শন-ই প্রাথমিক; আগে নিজকে জানতে হবে- অতঃপর সমগ্রকে। জেনেই থামলে চলবে না, অর্জিত জ্ঞানালোকে জীবন আলোকিত করে পথ চলতে হবে। প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতার এই অখণ্ড নিয়ম অনুসরণ করলেই অধরাকে ধরা যায়। জীবন দর্শনের এই মর্মবাণী জানতেন রাধারমণ। নারীকে তিনি প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকদের মতোই আদ্যাশক্তি জ্ঞান করে গেয়েছেন, “মাইয়ার কাছে জগৎ ঘোরে, কেহ তো তারে চিনতে নারে। মাইয়া যারে কৃপা করে সে জানে তার মনে কি সুখ।” আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে নাগার্জুনের দর্শনের প্রতিধ্বনি করেছেন তাঁর গানে, “মাইয়া সামান্যতো নয়, মাইয়াতে উৎপত্তি সৃষ্টি, মাইয়াতে উৎপত্তি প্রলয়, অনন্তগুণ মাইয়ার কাছে সর্বশক্তিময়।” এসবই লোকায়ত সহজিয়া-বৈষ্ণব দর্শনের আদি প্রবর্তকদের মতবাদের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, স্বরূপ দামোদর, রায় রামানন্দ, রঘুনাথ গোস্বামী, কৃষ্ণদাস গোস্বামী, গোপাল ক্ষত্রিয়, বিষ্ণুদাস, রাধাকৃষ্ণ চক্রবর্তী, গোবিন্দ অধিকারী, সিদ্ধ মুকুন্দদেব, জ্ঞানদাস ও শ্রী চৈতন্যদেবের সার্থক উত্তরাধিকার মহাত্মা শ্রী রাধারমণ দত্ত।

সহজিয়া-বৈষ্ণব দর্শন মতে সাধনার দুই-স্তর। এক. প্রতিটি নরই কৃষ্ণ, প্রতিটি নারীই রাধা। যেমন নররূপে নর, স্বরূপে কৃষ্ণ; তেমনি নারী রূপে নারী, স্বরূপে রাধা। সুতরাং, প্রত্যেক নর এবং নারীকে স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। দুই. সহজ মানুষ হওয়া দুরূহ। সামান্য এবং বিশেষ মানুষ সর্বত্রই আছে। কিন্তু সহজ মানুষ ভুবনে সহজে দৃষ্ট হয় না। তাকে গড়ে তুলতে হয় তিলতিল করে “রাগানুগা” ভজনে। এই ভজনের রয়েছে তিনটি ক্রমাবস্থান। এক. প্রবর্ত- এ অবস্থায় প্রথমে নামকে আশ্রয় করে সাধনা চলে। এ অবস্থায় সাধুসঙ্গ করতে হয় অর্থাৎ গুরুর আজ্ঞা পালন এবং ইন্দ্রিয় সংযম ও শৌচাদি আচরণ শিক্ষা লাভ করতে হয়। দুই. সাধক- এ অবস্থায় ভাবই আশ্রয় এবং কামজয় একান্ত আবশ্যক। সাধক অবস্থায় নিজকে প্রকৃতি মনে করতে হয়। তিন. সিদ্ধ- এ অবস্থার রয়েছে দুটি আশ্রয়, ১. প্রেম- মানব মনকে পরিপূর্ণ প্রেমরসে আদৃত ও ভাবরসে টইটুম্বুর করে যৌবন মন্থনে অগ্রসর হয়ে সাধনমার্গের চর্চায় আত্মনিয়োগ করেই মোক্ষলাভ সম্ভব। ২. রস- বৈষ্ণবমতে ভক্তভেদে শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য মাধুর্য্য- এই পঞ্চ রতি এবং পঞ্চ রতিভেদে শান্তাদি পঞ্চ ভক্তি রস এবং এটাই মুখ্য রস। এই মুখ্য রসে হৃদয়পটে ভক্তিযুক্ত বিভায় বিনম্র প্রেমের উন্মেষ ঘটে এবং তদ্‌গুণে মনে যে ভাবের উদয় হয় তদ্বারা কাব্য নির্মিত হয় যা সামাজিকগণের আস্বাদ্য আনন্দজনক ও উপাদেয় হয়। রস সম্পর্কে তিনি গেয়েছেন, “ধররে মন আমার বচন সাধু সঙ্গে কর বাস ॥ কামক্রোধ লোভ মোহমদদম্ভ সকলি হইবে নাশ। নিষ্কৈতবে প্রেম জাম্বুনদ হেম দেহতরী হইলে নাশ ॥ শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য মুখ্য মধুরে তাহার আশ।” অনিত্যলোকের ষড়রিপু (কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য) পরিহার করে নিজকে মায়াজাল মুক্ত করার কথা তাঁর গানে বারবার ধ্বনিত হয়েছে। এবং গুরুই পরমশ্বের কেবলমাত্র গুরু আজ্ঞা পালন করেই সহজিয়া সাধনার স্তর অতিক্রম সম্ভব। বারবার গুরুপদে ভক্তি ঠুকে গেয়েছেন, “গুরু কাঙাল জানিয়া পার করো।” শ্রী গুরুকে কল্পতরু ধ্যান করে গেয়েছেন, “দুর্লভ মানব দেহ আর কি হবে জানি না, চৈতন্য হইয়া রে মন গুরু ভজ না। ও মন, ধর্মগুরু কর্মগুরু দীক্ষাগুরু শিক্ষাগুরু, গুরু কল্পতরুরে মন তাই কি জান না।” লৌকিক জীবনের বৈষয়িক, নৈতিক অবক্ষয় থেকে উত্তরণে সাধনার কোনো বিকল্প নাই। সাধনায় সিদ্ধিলাভে “গুরু বিনে বন্ধু নাই রে আর” একথাও তাঁর গানে উচ্চারিত হয়েছে।

মহাত্মা রাধারমণ বৈষ্ণব দর্শনের এমন একটি কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন থেকে নিজ জীবনকে প্রবাহিত করেছেন ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতে, বিশেষ থেকে সাধারণে, নিত্য থেকে অনিত্যে, সমাজ থেকে প্রকৃতিতে। তাঁর এই কঠোর তপস্যার অবগাহনে তিনি যে সাধন-সাফল্য অর্জন করেছেন তা ছড়িয়ে আছে তাঁর গীতিসম্ভারে। উত্তরকালের প্রজন্মের জন্য তিনি রেখে গেছেন তাঁর অপূর্ব গীতসম্ভার। যা সঞ্জিবনী সুধাসম অমৃত সমান। সুকণ্ঠে তা গীত হয়ে শ্রুত হলে দেহ-মনের যন্ত্রণা-বেদনার উপশমে এবং ভার লাঘবে যেমন সহায়ক হয়, তেমনি কর্মে ও শ্রমে এই গীত বিপুল ও গভীর উদ্দীপনার জাগরণ ঘটায়।

বৈষ্ণব-সহজিয়া সাধনায় নিমগ্ন থেকে তিনি গান গেয়েছেন। প্রকৃতি ও জীবনের তত্ত্বানুসন্ধানে সারা জীবন ব্যাপৃত থেকে এই মহান মানুষটি এতো গীত রচনা করে গেছেন যে, তার সঠিক সংখ্যাটিও অদ্যাবধি আমরা উদ্ধার করতে পারিনি। আমাদের বাঙালী নাগরিক জীবনের মনন কাঠামো অধুনা এতোটাই সঙ্কীর্ণ-জীর্ণ আর নীচ-দীনহীন যে আমরা “বিদেশের কুকুর ধরি, স্বদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।” এই মহাপাতকী অবস্থান থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে, সাবেকী বাধিগৎ স্বৈরতান্ত্রিক সমাজের শোষণের জোয়ালের নীচে চাপা পড়ে থাকা এইসব রত্নখচিত অমূল্য লোকসাহিত্য-সংস্কৃতির নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা এবং সুনিয়মিত প্রকাশ নিশ্চিত করে জীবনে এর বিরামহীন চর্চা অব্যাহত রাখা। মেহনতী মানুষের জীবন-সংগ্রামের বিরহ-বেদনা মথিত, দলিত মনের অব্যক্ত বঞ্চনা আর দুঃখ-তাড়না এক অপূর্ব সুললিত গীতিময়তায় অভিব্যক্ত হয়েছে রাধারমণের গীতিকবিতায়। সমগ্র জীবনব্যাপী লোকায়ত দর্শনের তথা বৈষ্ণব-সহজিয়া দর্শনের যে সাধনা তিনি পদাবলী রচনার মধ্যদিয়ে করেছেন তা বাংলায় তথা ভারতবর্ষে সুদীর্ঘকাল ধরে চর্চিত।

আধুনিক বাঙালী জীবন সুদূরাতীত কাল থেকে গড়ে ওঠা এই সুমহান জীবন-দর্শন চর্চার পরম্পরা থেকে বহুকাল আগেই ছিটকে পড়েছে। ছিটকে কোথায় গিয়ে যে পড়েছে সে প্রশ্নও কোনোদিন আমাদের বিদ্বৎসমাজের বিদগ্ধ নাগরিক মননে জাগ্রত হয় না! জীবনের গভীর অন্ধকারের সারাৎসার থেকে মুক্ত হয়ে অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক জীবনের মেলবন্ধন ঘটানোর এতদ্বিষয়ক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যেদিন ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রে দৃশ্যমান হবে সেদিন থেকে বিশ্বমানব হওয়ার পথে, কায়মনে বাঙালী হওয়ার নবদ্বার উন্মোচিত করতে আমরা সক্ষম হবো। মহাত্মা শ্রী রাধাররমণ দত্তের একজন নগণ্য ভক্ত-অনুরাগী হিসেবে এই মহৎপ্রাণ মানুষটির অমর স্মৃতির উদ্দেশ্যে অন্তরের অবেক্ষণ, অবেণীসংবদ্ধভাবে নেহায়েৎ অর্বাচীনের মতোই নিবেদন করলাম বলে- ক্ষমো হে মম দীনতা!

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com