শিরোনাম
সোমবার  ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং  |  ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ১৯শে সফর, ১৪৪৩ হিজরী

বাউল সাধন তন্ত্র – সোমব্রত সরকার

প্রবন্ধ – সোমব্রত সরকার

তন্ত্রের মূল সাধন-কাঠামোই অনুসৃত করে নিয়েছেন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকেরা। তাঁরা মানব দেহের পাঁচটি চক্রের মধ্যে এক-একটি চক্রের শক্তিকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছন। তবে খেয়াল করার বিষয় তাঁরা কিন্তু তন্ত্রবাহিত সব মাতৃকাশক্তি-ই। যেমন— চণ্ডালী। ইনি বৌদ্ধ সহজিয়া পঞ্চ মরমিয়া যৌগিক শক্তির এক শক্তি। মূলাধারের যে শক্তি বৌদ্ধ সহজিয়ারা তার নাম করেছেন ডোম্বি। স্বাধিষ্ঠান ও মণিপুর চক্রের শক্তির নাম দিয়েছেন নটী। মণিপুর ও অনাহত চক্রে একেবারে প্রান্তদেশস্থ শক্তির নাম করেছেন রজকী। অনাহত ও বিশুদ্ধ চক্রের শক্তির নাম চণ্ডালি। আর সহস্রারের শক্তির নাম ব্রাহ্মণী। একে আবার যোগিনী নামেও অভিহিত করা হয়। সমস্ত শক্তিই হিন্দু তন্ত্রের মতনই রক্ত-মাংসের কোনও নারী নয়— যোগ অভিজ্ঞতায় নারীকল্পের শক্তি। বৌদ্ধ দেহাচারে যোগবলে যে ভয়ঙ্কর শক্তি উঠে আসে সাধক শরীরে, তা হল চণ্ডালী। মণিপুর চক্রাঞ্চল ছেড়ে দিলে শক্তি হুম্-হুম্ শব্দে অনুভূত হয় সাধক মনে। এই শক্তি বলা হয়ে থাকে চন্দ্রকিরণ বর্ষণ করে। চণ্ডালী হয়ে ওঠেন রূপকল্পনায় দেবী নৈরাত্মা বা অবধূতিকা অথবা প্রজ্ঞা। চর্যাপদে এঁর অহরহ উল্লেখ আছে। চণ্ডালীর মিলন হচ্ছে বৌদ্ধতন্ত্রে বজ্রসত্ত্বের সঙ্গে। এখানেও খেয়াল করার মতো বিষয়, হিন্দুতন্ত্রের শিব বিগ্রহের প্রতীকটি-ই কিন্তু বৌদ্ধতন্ত্র আহরণ করেছে। চণ্ডাকে এখানে করা হয়েছে ইড়া নাড়ি। পিঙ্গলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে বজ্রসত্ত্ব হিসেবে। নাম হয়েছে অলি। এই দুই নাড়িতে যখন প্রাণ ও অপান বায়ু একাকার হয়ে যায়, তখনই বৌদ্ধতন্ত্রমতে চণ্ডালি শক্তির উদয় হয়। সুষুম্না নাড়ি এ তন্ত্রে অবধূতিকা। চর্যাপদে চণ্ডালী, ডোম্বী, শবরী, যোগিনী, নৈরামণি— এই সব মহিলাত্মিকা শক্তির মিলনের কথা আছে— তিনটি নাড়ি অর্থাৎ চক্র অতিক্রম করার পর তোমাকে পেয়েছি। যোগিনী তোমাকে আলিঙ্গন করি। তোমাকে ছাড়া আমি এক মুহূর্ত বাঁচব না। তোমার ওষ্ঠ চুম্বন করে আমি পদ্মের মধু পান করব।
এখানে স্পষ্ট কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগার কথা বলা হচ্ছে। হিন্দুমতে, কুণ্ডলিনী মণিপুর চক্র পেরোলেই এই দশা দেখা দেবার কথা সাধক শরীরে। কিন্তু বৌদ্ধমতে, যোগিনীর সঙ্গে রাত্রে শয্যাবাসের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কিনা কুলকুণ্ডলিনী যোগিনী পর্যন্ত উঠলেই অজ্ঞানতা রূপ রাত্রির অবসান হয়ে আসছে সাধক শরীরে। বৌদ্ধতন্ত্রকে সহজ সাধনা বলা হচ্ছে। সহজ এখানে কিন্তু যুগল দ্যোতক। স হল স্ত্রী-তত্ত্ব— প্রজ্ঞা বা শূন্যতা বলা যেতে পারে একে। হ হল পুং-তত্ত্ব— উপায়, পন্থা, করুণার নামান্তর। সহজ মহাসুখের কথা বলছে আমাদের চর্যাপদ। এই সুখ স্ত্রী-পুরুষ তত্ত্বের নিট যোগফল। উল্টো সাধনার ক্রম অনুসারে এখানে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যকে শূন্যতার (হিন্দু তন্ত্র মতে পরম) চারটি স্তর অতিক্রম করতে হয়। এক— শূন্য, দুই— অতিশূন্য, তিন— মহাশূন্য আর চার— সর্বশূন্য। প্রথম স্তরে ৩৩টি, দ্বিতীয় স্তরে ৪০টি, তৃতীয় স্তরে ৭টি প্রকৃতি দোষ (প্রবৃত্তি) থাকে। সর্বশূন্যে কোনও প্রবৃত্তি দোষ থাকে না। এটিকে তাঁরা প্রভাস্বরশূন্যতা বলে চিহ্নিত করেন। যেমন, হিন্দুতন্ত্র বলে শেষ পদ্মচক্রে ব্রহ্ম-সাক্ষাত্কার ঘটে। এখানেই পরমাত্মায় বিলীন হয়ে পড়ে সাধক সত্তা। এই সহস্রদল পদ্ম ধ্যান করলে জগদীশরত্ব প্রাপ্তি হয়। বৌদ্ধতন্ত্রের মতো হিন্দুতন্ত্র-ও শক্তির নামকরণ করেছে। যেগুলো স্ত্রী-শক্তিকেই চিহ্নিত করে। মূলাধারে চিৎ, স্বাধিষ্ঠানে রাকিনী, মণিপুরে লাকিনী, অনাহতে কাকিনী, বিশুদ্ধে শাকিনী, আজ্ঞায় হাকিনী— এ সবই স্ত্রী নামাঙ্কিতা শক্তিরূপ। সাধককে এঁদের সঙ্গে যোগক্রিয়ায় মিলিত হতেই হয়।
নাথ ধর্মও খানিকটা হিন্দু-তন্ত্রজাত। নাথ সন্ন্যাসীরা কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে বলেন কুলটা। অর্থাৎ কিনা বেশ্যা। কারণ তাঁদের মত, আজ্ঞা চক্র পার হবের আগে এর ব্যবহার অত্যন্ত চটুল হয়ে পড়ে। কখনও স্থূল ইন্দ্রিয় সে আরও ইন্দ্রিয়াসক্ত করে দেয়, কখনও আবার ওপরে উঠে গিয়ে শিবকে আলিঙ্গন করে। তাই নাথপন্থীরা একে চিহ্নিত করেছেন কুলটা বা বেশ্যা হিসেবে। তবে নাথরা তাঁদের সাধনকে বলেন কায়া-সাধনা। নাথ সাহিত্যে রয়েছে: মধ্যযুগের বঙ্গদেশের রাজা গোপীচাঁদের মা ময়নামতি ছিলেন ডাইনি। তিনি সিদ্ধ যোগী গোরক্ষনাথের শিষ্যা ছিলেন। ডাইনির স্থূল অর্থ তুকতাককারিণী। আদতে কিন্তু তা একেবারেই নয়। ডাইনি হল ডাকিনীর অপভ্রংশ। ডাকিনীও স্থূল অর্থে ভূত-পেত্নীদের রূপকে স্পষ্ট করে। কিন্তু এই শব্দ এসেছে আসলে তিব্বতের ডাক শব্দ থেকে। যার স্ত্রী-লিঙ্গ ডাকিনী। ডাকের অর্থ হল জ্ঞান। ডাকিনীকে তাই বলতে পারি জ্ঞানী রমণী। তবে ডাকের আরেকটি অর্থ করা যায়— ড বা ডক্কানাদের মতো বিস্তারিত অবস্থায় কাম বা ইচ্ছে যুক্ত হয়ে ছুটে যাবার নামও ডাক।
বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্বেও নর-নারীর শরীর এবং দেহ-মিলনের মধ্যে দিয়ে পরমার্থ লাভের কথা বলা হয়েছে। তন্ত্রের মতোই এখানে বলা হয়েছও বলা হয়েছে: ব্রহ্মাণ্ডের সকল তত্ত্ব নিহিত আছে দেহভাণ্ডের মধ্যেই— বস্তু আছে দেহ বর্তমানে। বস্তু হল রসবস্তু। স্থূল অর্থের কাম। আর সূক্ষ্ণ অর্থে তা হল গিয়ে প্রেম। যাকে সহজ স্বরূপ হিসেবেও দেখানো হয়েছে। এঁদের মত, কাম ও প্রেম এক জিনিস কখনওই নয়। কাম প্রেমের প্রাকৃত রূপ মাত্র। আর এই প্রাকৃতকেই অবলম্বন করে অপ্রাকৃত সহজ প্রেমের দেশ নিত্য বৃন্দাবনে পৌঁছতে হবে। ‘রত্নসার’-এ যেন সেই কথাই ধ্বনিত হয়েছে।
সেই ত উজ্জ্বল রহে রসে ঢাকা অঙ্গ ৷
কাম হৈতে জর্ম প্রেম নহে কাম সঙ্গ ৷
লৌহকে করয়ে সোনা লৌহ পরসিয়া ৷
তৈছে কাম হৈতে প্রেম দেখ বিচারিয়া॥
বৈষ্ণব সহজিয়া সাধকরাও শক্তি সাধনার উদ্দেশ্যে যুগল সাধনা করে থাকেন। তাঁরা বলেন নারীর মধ্যে শৃঙ্গার-ভাবোদ্দীপক অগ্নিকুণ্ড আছে। সহজিয়া মতে, লৌকিক পীরিত-ই অপ্রাকৃত প্রেম হবা সহজ রূপ ধারণ করে। সহজকে তাঁরা দ্বিধা বিভক্ত-ও করেন। এক, আস্বাদ্য— যাকে রতি বলে মানেন তাঁরা, রাধা রতি আর দুই, আস্বাদক— যেটা হল তাঁদের রস, কৃষ্ণ রস। তাঁদের মতে প্রত্যেক নারী-ই রাধা আর প্রত্যেক পুরুষ হল গিয়ে কৃষ্ণ। এই ভাবে রূপস্থ অবয়বে তাঁরা তাঁদের যুগল সাধনাকে ভাবে আরোপিত করে থাকেন। রাধাকৃষ্ণকে তাঁরা শারীরিক করে তোলেন এভাবেই তাঁদের এক্কেবারে নিজস্ব বিশ্বাস বা মতাদর্শের সাধন-তত্ত্বমালায়। বৈষ্ণব সহজিয়া সাধন তাই আরোপ সাধন। এক অর্থে বলতে গেলে তন্ত্র-সাধনাও শিব ও শক্তির-ই যথার্থ আরোপ সাধন। বৈষ্ণব সহজিয়াগণ বলে থাকেন রূপের মধ্যে দিয়েই তাঁরা অরূপের দিকে এগিয়ে যান।
প্রাকৃত অপ্রাকৃত আর মহা প্রাকৃত ৷
বিহার করিছ তুমি নিজ স্বেচ্ছামত ৷
স্বয়ং কাম নিত্যবস্তু রস-রতিময় ৷
প্রাকৃত-অপ্রাকৃত আদি তুমি মহাত্রয় ৷
এক বস্তু পুরুষ প্রকৃতি রূপ হইয়া ৷
বিলাসহ বহুরূপ ধরি দুই কায়া॥
‘অমৃতরত্নাবলী’-তে রয়েছে শরীরের মধ্যেই কামনার কালসর্প বর্তমান। কামনা উদ্ভুত সেই কামকেই প্রেমে রূপান্তরিত করার কথা বলছে ‘বিবর্তবিলাস’-এ।
প্রেম-অপ্রেম কাম রহে এক ঠাঁই ৷
মিলন একত্রে, সে স্বরূপ ভিন্ন নাই॥
সহজিয়া বৈষ্ণবরা কামকে কিন্তু ধ্বংস করার কথা কখনও বলেননি। বলেছেন সাধন-সঙ্গিনীর সাহায্যে কাম-সাধনার মধ্যে দিয়েই আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছেকে কৃষ্ণেদ্রিয় প্রীতি ইচ্ছেতে পরিণত করতে। তাঁদের মত হল: কামের পরিতৃপ্তি না এলে প্রেম জন্মায় না কখনও। ‘রসকদম্বকলিকা’-তে তাই লেখা হয়েছে তারই অনুশীলন।
যখন সাধিয়া কাম পূর্ণ হয় মনে ৷
তবে তো স্বরূপ কামবস্তুতত্ত্ব জানে॥
আর উল্লেখিত সেই ‘অমৃতরত্নাবলী’-তে কামকে সাপের স্বর-তরঙ্গের প্রবল হিস্ হিস্ –ই দেওয়া হয়েছে। তন্ত্রে সাপ কুণ্ডলিনীস্থ শক্তি। যার আভ্যন্তরীণ রুদ্ধদলে সাধনার সংকল্পময়তার সুদৃঢ় সব ঘোষণা রয়েছে। সাধক তান্ত্রিক মানেন বীর্যের মধ্যে প্রাণশক্তি হিসেবে থাকে সাপ। সাপকে আবার কামশক্তির প্রতীক করেও দেখানো হয়। শক্তিকে সাপ বলা হয়ে থাকে তন্ত্রমতে। যা সুপ্ত অবস্থায় থাকে কুণ্ডলীতে। গুহ্যদ্বার ও লিঙ্গমূলে সাপ থাকার কথা বলেন দেহসাধক। ‘অমৃতরত্নাবলী’ তাকেই নির্দেশ করছে।
শরীর ভিতরে জান আছে কালসর্প ৷
সেই সর্পে দিবানিশি করিছে দংশন ৷
কাম নিবারতে নারে জীব নরাধাম॥
এখানে সাপ কিন্তু কামনাদ্যোতকই। কামও তো আসলে এক উত্তেজিত ক্রিয়াকর্মের দ্বৈতশক্তি। এই শক্তিকেই বৈষ্ণব সহজিয়া সাধক প্রেমে রূপান্তরিত করে নেন। ‘অমৃতরত্নাবলী’-তে সে-কথাও বলা রয়েছে।
প্রথম সাধন রতি সম্ভোগ শৃঙ্গার ৷
সাধিবে সম্ভোগ রতি পালাবে বিকার ৷
জীবরতি দূরে যাবে করিলে সাধন ৷
তারপর প্রেমরতি করি নিবেদন॥
সহজিয়া বৈষ্ণব মত হল— নারী সান্নিধ্যে না এলে, বাস্তব সম্ভোগের অভিজ্ঞতা না হলে প্রকৃত রসিক কখনও-ই হওয়া যাবে না। বস্তুগত দেহতত্ত্বের মধ্যে দিয়েই তাঁরা লোকায়ত সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়েছিলেন। যেখানে সাধিকার সংস্পর্শে অন্তরঙ্গ ভাব-শৃঙ্গার ছিলই তন্ত্র-সাধনার সংযুক্ত ঐতিহ্যে। সহজিয়া বৈষ্ণবরা স্বকীয়া রতির চেয়ে পরকীয়া রতিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন রাধা-কৃষ্ণের সেই আরোপিত ভাবানুষঙ্গেই। অপরদিকে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের ভাব স্বকীয়া হলেও বৃন্দাবনের গোস্বামীরা যে ধর্মতত্ত্ব প্রচার করে গেছেন তাতে রাধা এবং গোপীদের প্রেমকেই আদর্শায়িত করে দেখানো হয়েছে। তাহলে দাঁড়াল এই: সেখানেও পরকীয়া ভাবনা প্রতিভাত রয়েছে। শ্রীখণ্ডের নরহরি সরকার যে ‘গৌরনগরবাদ’ প্রচার করেছেন সেখানে দেখানো হয়েছে যে, গৌরাঙ্গের প্রেমে নবদ্বীপের নারীরা সব উন্মাদিনী হয়ে পড়েছিলেন। নরহরির শিষ্য লোচনদাস ঠাকুর তাঁর ‘চৈতন্যমঙ্গল’-এ গুরুর ভাবে প্রাণিত হয়েই বোধহয় গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়ার মিলনদৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। যে বর্ণনা অনেকাংশেই সহজিয়া বৈষ্ণব মতের সাধক-সাধিকার প্রেম-শৃঙ্গারের বর্ণনাই হয়ে গিয়েছে।
ইহা বলি গৌরহরি
আশ্লেষে চুম্বন করি
নানা রস কৌতুক বিহারে ৷
অনন্ত বিনোদ প্রেমা
লালী লাবণ্যের সীমা
বিষ্ণুপ্রিয়া তুলিল প্রকারে॥
এভাবেই বৈষ্ণব সহজিয়ায় শরীর বা যৌনতার নিরীখে সাধ্যবস্তু লাভের তত্ত্ব প্রচারিত হয়েছিল। যা যৌনতাকে প্রান্তবাসী প্রবহমানতার মধ্যেই ঠেলে দিয়েছিল। যৌনতা হয়ে উঠেছিল বৃহত্তর সমাজের অগোচরে ধর্মীয় আবেগ-আখরে বিস্ময়-মাধুর্যের স্বাদ। যা কামকে পরমে, শূন্যতায়, প্রেমে কতখানি অন্তর্গত করে রেখেছিল সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে এটা বলাই যায়, লোকায়ত সাধনায় শরীর সংযত-নিষ্ক্রিয়তার দাবি করলেও আসলে তা ভীষণভাবেই যৌথ উচ্চারণেই সক্রিয় ছিল। তারই সন্দর্ভ সব আচরণ ইঙ্গিতের কাব্যময় তত্কালীন ধ্বনিতরঙ্গের পটভূমি।
চর্যার ভাষার দু’ রকম অর্থ রয়েছে। লৌকিক অর্থ আর গূঢ় অর্থ। বক্তব্যকে শব্দ ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার সাহায্যেও আচ্ছন্ন করা হয়েছে। এর কারণ সাধন-প্রক্রিয়াকে সাধারণত আচার্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা। সহজ সাধনমালার মূল লক্ষ্যই কিন্তু ছিল তাই। এক বেষ্টিত আড়াল। যেখানে সাধক বা সাধনরত শিক্ষানবিশ ছাড়া অন্যের প্রবেশাধিকার অন্যের প্রবেশাধিকার একেবারেই নিষিদ্ধ। বাংলার সহজ সাধনাতেও তার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখে থাকি। বাউল বলেন— আপন ভজন কথা না কহিবে যথা-তথা,/ আপনাতে আপনি হইবে সাবধান। এই সাবধান বাণী গুরুর উপদেশ শিষ্যের প্রতি। বাংলার বাউলের সহজ-সাধনা ও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের যে মান্য সহজ-সাধনার প্রামাণিক মূল্যের দিকে আমরা চোখ ফেরাচ্ছি, যৌনতার রূপস্থ শিল্প-কর্মের সর্বদর্শী ছবিটি দেখার জন্যে, দুটোর ভরকেন্দ্র কিন্তু একই। দুটোর ভেতরেই ধর্মতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্বের বিবিধ নির্দেশ-দান আছে। আর সেই নির্দেশের মূলমন্ত্র বা ধারক-বাহক হল কাম-নিয়ন্ত্রণ। আর দুই সাধনেই নারী অনিবার্য। প্রশ্ন হচ্ছে, নারীকে যৌনলক্ষ্যের বশীভূত করে যে ভাষারূপের ধর্মগত ভাবনা তৈরি করলেন সিদ্ধাচার্যরা ও বাউল সাধকেরা সেখানে অব্যর্থ শৃঙ্খলার শিল্পলক্ষ্য আছে ঠিকই— যে লক্ষ্য মূলত যৌনতা বা কামাচারকে জীবনের অনুষঙ্গ-সৃজনী-ক্ষমতার সার্বিক সব স্বাচ্ছন্দ্য থেকে অব্যাহতি দেওয়া, সেই লক্ষ্য কতখানি সাধকদের অভিজ্ঞতায় নিদর্শিত হচ্ছে? নর-নারী তাঁদের স্বাভাবিক মিলন প্রয়াসকে ধর্মের স্তবকে অস্তিত্ব-বোধের রূপময় প্রেরণায় অশেষ সাধনারয় সার্থকভাবে রূপায়িত করে নিচ্ছেন নায় বুঝলাম, কিন্তু কথা হচ্ছে যৌনতাকে, কামাচারকে কিছু শৃঙ্খলায় প্রাণবন্ত করে দিয়ে যে শূন্যতা বা সহজানন্দকে তাঁরা পেতে চাইছেন সেখানে সম্বৃত-শ্বাসবায়ু ও স্তব-আসনে দুই শরীরের ক্রিয়াশীল সৃজন বৃত্তে বস্তুরক্ষা বা বীর্যপাত ঠেকানো ছাড়া স্বাভাবিক-সাধারণ যৌনতার থেকে আলাদা ব্যঞ্জনা কি আপাতিক চোখে দেখা দিচ্ছে কিছু? বুঝলাম যৌনতাকে তাঁরা আসক্তিহীন করছেন। ভাব-প্রেরণার আকর্ষণে ডুবে কামকে আশ্রয় করেই কামকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন শরীর থেকে। কিন্তু কাম কি অনুষঙ্গ সৃজনের প্রেমকে সৃষ্টি করতে পারছে আদৌ? প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অনেকে হয়তো বলবেন, পথে না নামলে পথ জানা যায় না। কিন্তু যৌনতার আত্যন্তিক বিনষ্টি হচ্ছে যৌনতার সমস্ত রকম উপাচারকেই সাজিয়ে নিছক শান্তি-বাসনার প্রতিনিধি হিসেবে— সর্বক্ষেত্রে এ মত কখনও-ই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে এটা ঠিক, দেহ-সাধনার পথ ও পন্থা রস-লক্ষ্যের অধিগত অধ্যায়কে শিল্পীর তপস্যায় কাব্যের উত্কর্ষ সাধিত করবার জন্যই যে বেশ ভেবে-চিন্তে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন সাধক পদকর্তারা সব— সেটা কাব্য-ধৃত অভিজ্ঞতার সংহত ভঙ্গিটির দিকে তাকালেই বেশ বোঝা যায়। আর এটাও চিহ্নিত করা যায় যে, শুধু কাব্য-রসামৃত পান করানো আগামী পাঠককে (শিষ্যকে), সাধকগণের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না, বরং যুগল লৌকিক কর্মময় জীবনকে অন্তরশায়ী কল্পনার পক্ষে নিয়ে গিয়ে অলৌকিক স্পর্শের স্বরূপ উপভোগ করাই তাঁদের লক্ষ্য ছিল। আর সেটার জন্যই যৌনতার অভিব্যক্তিকে তাঁরা শিল্পসম্মত রূপে ব্যবহার করেছিলেন ধর্মীয় গহন স্রোতে, সাধনার পরম প্রসন্নতায়। যেখানে নারী বা সাধন-সঙ্গিনী প্রথাসিদ্দ মান্য সংস্কারে অনিবার্য হয়ে আছে সাধনের পরম্পরায়।
বাউল বলছেন:
মেয়ের চরণ নেরে মাথায় করে
মেয়ে বিনে এ ভুবনে গতি নাই রে।
ত্যাজে নারী বনবাসী
হলি রে মর্কট সন্ন্যাসী
তার চরণে গয়া-কাশী
দেখলিনে রে।
অর্থাৎ, মেয়ের চরণ মাথায় করে রাখবার কথা বলছেন পদকর্তা। তিনি বলছেন মেয়ে ছাড়া পৃথিবীর গতি নেই। রমণীকে ত্যাগ করে বনবাসী হলে পর সে মর্কট সন্ন্যাসী। কেন না নারীর চরণ হল গয়া-কাশী।
বাউল এক মরণে দুইবার মরার কথাও বলে থাকেন:
যেমন চণ্ডীদাস আর রজকিনী হয়
তারা এক মরণে দুইজন মরে— সাধুলোকে কয় ৷
আবার চণ্ডীদাস মরিয়া গেলে
রজকিনী বাঁচায় তারে,
যার যে আছে যার তার কাছে,
লালন বলে আমার তো দিন যায় কাঁদিতে।
বাউলের আরাধ্যা নারী প্রেমময়ী। নারী এখানে শক্তির আধার। ভারতীয় পুরাণও তো তাই-ই বলে এসেছে। দুর্গাকে তো আমরা শুভশক্তির সঙ্গেই তুলনা করতে পারি। আর অসুর হল আমাদের অশুভ বোধ বা অশুভ শক্তি। বাউল কল্পনার রাধা-কৃষ্ণকে নিজেদের ওপর আরোপ করে বসেন। তাঁদের কাছে তিন যুগলের প্রেম সাধনাই লক্ষ্য। সে জন্য পদগুলোতেও তাঁদের যুগল রূপের কথাই বলা হয়েছে। প্রথম যুগলের কথা এই গানেই রয়েছে। দ্বিতীয় যুগল হল জয়দেব-পদ্মাবতী। তৃতীয় যুগল বিল্বমঙ্গল-চিন্তামণি।
তবে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সহজিয়া এবং বাউলের সহজিয়ার মূলগত পার্থক্য একটা আছে। সিদ্ধাচার্যরা তান্ত্রিকতায় ঝুঁকেছেন। সেজন্যই কাহ্ন কাপালিক হয়েছেন। আর বাউল সাধকরা বৈষ্ণব ভাবাপন্ন। তবে এরকম ভাবার কারণ নেই যে, বাউল আর বৈষ্ণব এক। তা কখনও কিন্তু নয়। যদিও দুই সম্প্রদায়ই সাধন সঙ্গিনীর কথা বলে থাকেন। মাধুকরী করেন। তথাপি এঁদের মূলগত পার্থক্য বাউল মূর্তিপূজোয় বিশ্বাসী নন একেবারেই। মানুষের মধ্যেই বাউলরা রাধা-কৃষ্ণের দ্বৈতসত্তাকে খুঁজে ফেরেন। মানুষকে তাঁরা সহজ মানুষ, মনের মানুষ, ভাবের মানুষ, রসের মানুষ, ইত্যাদি নানান অভিধায় ভূষিত করেন। তবে বলে রাখা ভালো, এইসব ভূষণ-শিরোপা সবই আসলে যৌন প্রাণস্পন্দনকে, উত্তেজনাকে গভীর বিস্তৃতির অন্তরশায়ী অনুভূতির মাধ্যমে দেখানো। সেই অনুভূতিতেই মানুষকে আধারভূমি করা হয়েছে সাধনাকে ঘোর দুর্যোগের রাত্রি দাবি করে রুদ্ধার্গল ঘরের সুখসুপ্তি ও শান্তির কামনা করে। তার জন্যই শরীরতত্ত্ব, দেবতত্ত্ব, মানুষতত্ত্ব, ইত্যাদি নানান সব সু-সার্থক অর্থ-সঞ্চারের পরিমণ্ডল গড়ে তোলা হয়েছে ভাবে-ভাষায় প্রতীক বা গুহ্য শব্দের মাদকতায়। মানুষ তাই হয়ে উঠেছে নির্দিষ্ট এই এলাকার রসসম্ভোগের মানুষ।
মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
সে কি অন্য তত্ত্ব মানে?
মাটির ঢিবি কাঠের ছবি
ভূত ভাবি সব দেব আর দেবী
ভোলে না সে এসব বাণী
ও যে মানুষরতন চেনে॥

ক্রমশ
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com