বুধবার  ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ১৮ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

হিমবাহ গলে যাচ্ছে : ভেড়ার চামড়ায় মুড়িয়ে হিমবাহ রক্ষা

হবু রাজা বলিলেন গবু মন্ত্রীকে, কাল সারা রাত আমি ভাবিয়া দেখিয়াছি, ধরণীতে চরণ ফেলামাত্র কেন মলিন ধুলা পায়ে লাগে! জগত্ হইতে ধুলা দূর করিতে হইবে। ধুলা দূর করিতে গিয়া রাজা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের ডাকিলেন। পরামর্শ লইলেন। শেষে সিদ্ধান্ত আসিল সমগ্র পৃথিবী ঝাড়ু দিয়া ধুলা দূর করিতে হইবে। শুরু হইল রাজ্যব্যাপী ঝাড়ু দেওয়া কর্মসূচি। রাজা দেখিলেন—‘করিতে ধুলা দূর, জগত্ হলো ধুলায় ভরপুর।’ এইভাবে নানান বিদঘুটে বুদ্ধি শেষে আবিষ্কার হইল জুতা! ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়টি এমনই চমকপ্রদ রহস্য-রসায়নে উপস্থাপন করিয়াছেন।

সুইজারল্যান্ডে অবশ্য কোনো হবু রাজা নাই। তবে তাহাদের গৃহীত একটি পদক্ষেপের সহিত জুতা আবিষ্কারের সাদৃশ্য খুঁজিয়া পাইতে পারেন কেহ কেহ। উষ্ণায়নের ফলে সুইজারল্যান্ড তাহাদের একটি হিমবাহের গলন হইতে রক্ষা করিতে অভিনব পথ বাছিয়া লইয়াছে। প্রতি গ্রীষ্মে আস্ত হিমবাহটি তাহারা ভেড়ার পশমে তৈরি সাদা রঙের কম্বলে মুড়িয়া ফেলিতেছে। আর এইভাবেই হিমবাহটির গলিয়া পড়া রোধের চেষ্টা করিতেছে তাহারা। রোনে নামের পর্বতের হিমবাহটি সুইজারল্যান্ডের জন্য শুধু যে পরিবেশগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ তাহা নহে, ইহার ধূসর পৃষ্ঠ ও ৩৩০ ফুট দীর্ঘ নীল রঙের বরফের গুহা দেখিতে প্রতিবত্সর লাখো পর্যটক আসেন এতদঞ্চলে। সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতির বিপুল জোগান আসে এইখান হইতে। যদিও এই উদ্যোগের কার্যকারিতা জুতা আবিষ্কারের সহিত তুলনা করা যুক্তিযুক্ত নহে। কারণ, কম্বল ব্যবহারের ফলে রোনের গলিয়া পড়া ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব হইতেছে—ইহা কম কথা নহে। যদিও ইহাকে স্থায়ী কোনো সমাধান হিসাবে বিবেচনা করিবার কারণ নাই। তবে কেবল সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ নহে, সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা অসংখ্য হিমবাহ ক্রমশ হুমকির মুখে পতিত হইতেছে। এই যেমন কিছুদিন পূর্বে পুরাপুরি গলিয়া যাওয়া ওকিয়োকুল হিমবাহের জন্য স্মরণসভার আয়োজন করা হইয়াছে আইসল্যান্ডে। বাড়ন্ত তাপমাত্রার কারণে গলিতেছে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার ঠোয়েইটস হিমবাহ। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, এই হিমবাহ পুরো গলিয়া গেলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়িবে ৫০ সেন্টিমিটার, যাহা ডুবাইয়া দিবে পৃথিবীর অনেক অংশ। অ্যান্টার্কটিকার পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিমবাহ রহিয়াছে চিলিতে। সেইখানের গ্রে হিমবাহের দ্রুতগতিতে গলিয়া যাওয়াটাও আসন্ন বিপদের লক্ষণ।

সুতরাং হিমবাহের গলন রোধ করিতে বিজ্ঞানীরা অভিনব সব উদ্যোগ গ্রহণ করিতেই পারেন। জানা গিয়াছে, সূর্যের তাপের কিছু অংশ মহাকাশেই ফেরত পাঠাইতেও অভিনব উদ্যোগ লইয়াছেন বিজ্ঞানীরা, যাহার পৃষ্ঠপোষক হিসাবে রহিয়াছেন বিশ্বের প্রভাবশালী বিত্তশালী ব্যক্তি বিল গেটস। বিজ্ঞানীরা ঠিক করিয়াছেন, বেলুনের সাহায্যে দুই কিলোগ্রাম ওজনের ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের গুঁড়া বিশেষ পদ্ধতিতে স্প্রে করা হইবে পৃথিবীর ওপরে থাকা বায়ুমণ্ডলীয় স্তর স্ট্রাটোস্ফিয়ারে। ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের গুঁড়া স্টাটোস্ফিয়ারের বেশ কিছুটা এলাকা জুড়িয়া ছড়াইয়া গিয়া তৈরি করিবে একটা সানশেড। এইভাবেই আকাশে তৈরি হইবে সানশেড, যেই সানশেডে বাধা পাইয়া বেশ কিছু পরিমাণ সূর্যরশ্মি আবার ফিরিয়া যাইবে মহাকাশে।

পৃথিবীকে রক্ষার চেষ্টার শেষ নাই। এই সকল উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাইতেই হয়।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত *

*

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com