সোমবার  ২রা আগস্ট, ২০২১ ইং  |  ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জিলহজ্জ, ১৪৪২ হিজরী

হাকালুকি হাওর ধংষ, লুট ও পাট চল‌ছে :২০ হাজার জলজবৃক্ষ কেটে বাঁধ

হাকালুকি হাওরের মালাম বিলে বাঁধ নির্মাণের নামে ২০ হাজার হিজল, করচ ও বরুণ প্রভৃতি জলজবৃক্ষ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। দেশের সবচেয়ে বড় এই হাওরে এসব জলজবৃক্ষ প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এবং কিছু পরিবেশ অধিদফতরের অর্থায়নে রোপিত। এদিকে এ বিষয়ে এখনও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগ। এতে হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে জলজ বনের পাহারাদার আব্দুল মনাফ গত ৩০ মে সাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগের অনুলিপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী, পরিবেশ অধিদফতর ও জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের অর্ন্তভুক্ত বড়লেখা উপজেলাধীন মালাম বিলের (মৎস্য জলাশয়) আয়তন ৪২৮.৯২ একর। বাংলা ১৪২৭ থেকে ১৪৩২ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৩ টাকায় মালাম বিলটি ইজারা নিয়েছে বড়লেখা উপজেলার মনাদি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি।

মালাম বিলের কান্দির (পাড়ে) সরকারি ভূমিতে পরিবেশ অধিদফতর ২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নে হিজল, করচ, বরুণসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ বৃক্ষ রোপণ করে। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো জলজ বৃক্ষের রক্ষণাবেক্ষণ করে।

বর্তমানে প্রাকৃতিক ও পরিবেশ অধিদফতরের রোপিত জলজ উদ্ভিদগুলো ১৪-১৫ ফুট উচ্চতার হয়েছে। যা হাকালুকি হাওরের ইসিএ এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে বিশেষ অবদান রাখছে। গত মে মাসের প্রথমদিকে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ইজারাদারের লোকজন বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে পরিবেশ অধিদফতরের ও প্রাকৃতিক জলজ বনের গাছ অবৈধভাবে কেটে নিয়েছে।

হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী (বনায়ন পাহারাদার) আব্দুল মনাফ ও আরফান আলী বলেন, ‘মালাম বিলের ইজারাদার সমিতির লোক উপজেলার কাজিরবন্দ গ্রামের মক্তদির আলী, মশাইদ আলী, রিয়াজ উদ্দিন, জয়নাল উদ্দিন, কালা মিয়া, সুরুজ আলী, মনাদি গ্রামের জয়নাল উদ্দিন এক্সভেটর দিয়ে মে মাসের প্রথম দিকে বিলের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সরকারি ভূমির জলজ বৃক্ষ নিধন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। আমরা বাধা দিলে তারা মানেনি।’

স্থানীয় সূত্র জানা গেছে, বন বিভাগের বিট কর্মচারীকে বৃক্ষ নিধনকারীরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগের হাকালুকি বিটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা তপন কুমার দেবনাথ বলেন, ‘পাহারাদারের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। তার নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারিনি।’

এ বিষয়ে মালাম বিলের ইজারাদার সমিতির পরিচালক জয়নাল উদ্দিন বলেন, ‘জলমহাল ইজারায় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির শুধু নাম ব্যবহার করা হয় তা সবাই জানেন, তবে আড়ালে প্রভাবশালীরা বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারীরাই এখানকার গাছ কেটেছেন, বাঁধ দিয়েছেন। তবে এটা মোটেও ঠিক হয়নি। তারা প্রশাসনের সঙ্গে বিষয়টি মিটমাট করবেন বলে কথা হয়েছে।’

গাছ কাটার বিষয়টি অবগত আছেন জানিয়ে পরিবেশ অধিফতরের বাস্তবায়নাধীন ইবিএ প্রজেক্টের অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স অফিসার (এএফও) সাহিদ আল শাহিন বলেন, ‘হিজল-করচ গাছ কাটার ঘটনাটি পাহারাদার আমাকে জানিয়েছেন। অফিসের কাজে আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। তারা জানায় দুষ্কৃতকারীরা প্রায় ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ইসিএভুক্ত মালাম বিল এলাকায় প্রায় ৭০ একর জায়গায় হিজল-করচসহ পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো অনেক বড় হয়েছিল। এ ঘটনায় পাহারাদার থানায় ও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ইসিএভুক্ত এলাকায় সরকারি অনুমোদিত প্রকল্প ব্যতীত গাছ কাটা, খনন, স্থাপনা নির্মাণ, পাখি শিকার করা ইত্যাদি বেআইনি। গাছগুলো কাটায় হাওরের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

পরিবেশ অধিদফতর মৌলভীবাজারের সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা বলেন, ‘গাছকাটার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। শিগগিরই জায়গাটি পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বড়লেখা উপজেলার (ইউএনও) খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী বলেন, ‘গাছ কাটার ঘটনাটি আমার যোগদানের আগেই ঘটেছে। মালাম বিলের পাড়ের ব্যাপক জলজ বৃক্ষ কেটে ফেলার একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্দেশ দিয়েছি। প্রতিবেদন পেলে দোষীদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com