সোমবার  ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ২০শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

স্বপন দেলওয়ার এর গুচ্ছ কবিতা

মেঘ মেয়ে মমতার জন্য
স্বপন দেলওয়ার

অনিন্দ্য দহনতাপে ভালোবাসা জমে জমে মেঘ হয়
জীবনের অনু পরমাণু কেলাসিত
ডাগর চোখের বৃষ্টিফোঁটায় খেলে বিশুদ্ধ প্রেম

অথচ এমন দিনকাল রোদ-বোমাতে ফাটছে আমার গাঁ
সমস্ত শহর কেমন অলক্ষুণে প্রদাহপ্রবণ
পলায়নপরতায় হাঁপাচ্ছে

তুমি পুড়ে যাচ্ছো প্রিয়তমা স্বেচ্ছা-নির্বাসনে
কে ফেরাতে পারে আমি অসমর্থ কবিতা ফেরার
মেঘ না জমলে কবিতা অচল
এখন আর না বাড়ানোই ভালো

বন্ধুরা, আসর ভেঙ্গে আসুন বেরিয়ে পড়ি
কে জানে ঐ মেঘ মেয়েটা কিড্ন্যাপড হয়ে গেল কিনা
হাত বাড়ালেই হিমালয় মালা-
দার্জিলিং কালিম্পং থেকে শিলিগুড়ি হয়ে শুরু হোক
তিস্তার তীর বেয়ে অনুসন্ধান……

নদীগুলো বাধা পড়ে গ্যাছে তাই ওইপাড়ে
বুকভরা ভালোবাসা শুকিয়ে পাথর
মেঘপাখনা মেলে আর উড়তে পারে না সাদাকালো প্রেম

চলো না দক্ষিনে সুন্দরবনের ওপার
বঙ্গ-সাগর বুকে হতাশ্বাস ঘুরপাক খেতে খেতে
বিক্ষোভ নিজেই কেমন সোনালী বারুদে পুড়ে ছিন্নভিন্ন
মেঘ নেই মমতাও মৃত জোনাকীর রূপ
খুব ভয় ওরা সব মার্কিন সেনা টহলের সীমানায়

আটকা পড়লো না তো?
পুঁজিবাদের দাপট যেমন
ভব্যতার সীমারেখা ছাড়িয়ে বিশ্ববাজার সয়লাব
প্রোটোটাইপ রেজিষ্ট্রেশনের কূটচালে আমাদের মেঘগুলো
খুউব ভারী হয়ে জমছে হয়তো
ফ্লোরিডা কিম্বা ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে
হতে পারে অন্ধ্র-হারিয়ানায় চেরাপুঞ্জীর গহনে

ভয় পেয়োনা প্রিয়তমা,
ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলে বর্ষা ঠিকই জাগবে
মেঘ শাড়ীটা পরো বাজবে মিলন সঙ্গীত।

বৈশাখী প্রার্থনা
-স্বপন দেলওয়ার

যতই ফাটুক বোমা বৈশাখ ফেরাবে না মুখ
হৃদয় সূর্যের গানে শাশ্বত উদ্ভাস
বিপন্ন পৃথিবীর বুকে ফুটবে নিরন্তর
নতুন দিনের প্রেম।

হে বিশাখা সন্তান
কোন অন্তহীম আজন্ম আবেগে
অগাধ তৃষ্ণা-তাড়নায় অব্যক্ত উন্মোষ
সে কোন মায়া-মোহ-প্রেমে
বঙ্গ-ললনাকে ভালোবেসেছিলে?
আর তাই ফিরে আসা বার বার
ঐ দূর তারকালোকের শুভাশীষ বয়ে আনা
হাজার আলোকবর্ষ পারে পৃথিবীর ঠিকানায়!

প্রতীক্ষায় ছিল প্রিয়তমা ফুলে ফুলে সাজানো বাগান
চন্দন বুকে চাপা ব্যাকুলতাবোধ
খোঁপাটি জড়ানো বকুলে তার
পূর্ণিমার চাঁদ ছিলো কপালের টিপ।
সে তোমার বসন্ত প্রিয়া
গতকাল চলে গ্যাছে নক্ষত্রের সুদূর ওপার
নিয়তির রথে ছিলো নি:শব্দ বিদায়।

তাই বুঝি রোষানল দহনের রৌদ্র করাত
সমুদ্র হাহাকার ঘনায়িত বিক্ষোভে
লন্ডভন্ড করে দেয়া ঘূর্ণীতান্ডব
আবার স্বপ্ন উচ্ছ্বাসে মিলনাকাক্সক্ষা
বুকভরা ভালোবাসা ঢেলে
শস্যময় সমৃদ্ধির আশ্বাসে ভরাও বসুন্ধরা।

ও আমার অবাধ্য উতাল
মত্ত মাতাল পাগলা বৈশাখ
তোমার ছোঁয়ায় ভাসবো সবাই
প্রেমপ্রিয় প্রাণ উন্মাদনায়
বিনাশী মাতম নয় আমাদের দাও
সৃষ্টি আর বৃষ্টির কল্যাণ।

ফিরে যেতে চায়
-স্বপন দেলওয়ার

ফেব্র“য়ারী পাঁচ ছয়
ঊনিশশ’ সাতাশি
নাকি সেই পহেলা ফাল্গুণে
ফোটা কলি দোসরায়
ভ্যালেন্টাইন
তার নাকি অনিতার
সন্ধ্যা ও সুদূর দুপুর
সেইসব বিষন্নতার মোড়কেও
আনন্দমুখর খুউব
প্রগল্ভ সময়ের ইশারায়
কৌশোরের সাঁকো বেয়ে পরস্পর
অঁাকাবাঁকা মেঠো পথ

মন ফিরে যেতে চায়
বহুদূর ফেলে আসা গ্রামে

সৈনিক
-স্বপন দেলওয়ার

বিস্ময়ের ঘোর চোখে অথবা সম্মোহন
ডেকে নিতে চায় ক্লান্তির অবসরে
নির্জনতার ঘরে
ঝিনুক বুকের খোঁজে
তীব্র কটির বাঁক
খাজুরাহো রাতের স্বপ্ন….

এইসব মিলেমিশে একদিন চিরকাল
উদ্গ্রীব রমনীর টান
আমূল বিদ্ধ করে
আমি রক্তাপ্লুত ক্ষতবিক্ষত তবু
তোমার স্বপ্নময় অভিজাত হৃদয়ের মোহ
আমাকে উদ্ভ্রান্ত অথচ এক
সংকল্পিত সৈনিক কোরে তোলে

কবে যে আবার বেড়াতে বেরুবো
সঙ্গী তুমি একা
নিঃসঙ্গ দিনের তৃষ্ণা
-স্বপন দেলওয়ার

একান্তে যাবো একদিন
প্রাত্যহিক রূঢ়তাকে রুদ্র মধ্যাহ্নে
কোণঠাসা কোরে রেখে
কোমল রাত্রির মুখোমুখি
কর্মযন্ত্রণার সমূহ বন্দীতা ছেড়ে
নিভৃত দুপুরের ঘরে
অনাবৃত হতে হতে নমনীয় নত
সুগোপন আকাঙ্খার স্বপ্নময়
আচ্ছন্নতায় ক্যানভাসে তুলির স্পর্শ
আর্দ্র চুম্বনের নদীমাতৃক পটভূমি
দুর পাহাড়ের চূড়া থেকে
ঝর্ণাধারা আর উত্তাল নদীর
স্বচ্ছতায় স্রোত
চাঁদের পাহাড় বেয়ে মেঘের মিনার
ছুঁয়ে যেতে যেতে
আরক্তিম আঙুর কন্টক বেঁধা
তালুতে দু’মুঠো পায়রার
সুকোমল উত্তাপ
পাহাড় নদী-বনÑএসবের
অসরল ভাঁজে ভাঁজে ভ্রমণের সুখ
পান করে হৃদয় বন্দরগামী
নি:সঙ্গ দিনের তৃষ্ণা

 

পলাতকা
-স্বপন দেলওয়ার

যেখানেই থাক পলাতকা
একাকীত্বে ঘুমের গভীর অন্ধকার
অথবা বিস্মরণের সপ্তাহান্ত রাত
আগত গ্রীষ্মের নিশ্চিন্ত ভ্রমণ
ভূ-মধ্যসাগর সৈকতে
সাইপ্রাস সিসিলি ঘুরে
মায়ামীর বালুতটে
অথবা প্রশান্ত দ্বীপের দেশ
হাইতি হাওয়াই জাভা
ফিলিপিন বন্দরে
পালাবার মতো
অচেনা সুদূর নগরীর দিকে
বনানীর ছায়াঘেরা নিভৃত পর্বতে
ভীষণ ছুটবার দিন
নি:সঙ্গ পূর্ণিমার নীচে
বন পাহাড়ের ছায়াছবি
স্মৃতির কৈশোর জুড়ে
এক যুবকের ভালোবাসা প্রেমে
স্বপ্ন পুরুষের আমূল আস্বাদন
উত্তরচিন্তা
-স্বপন দেলওয়ার

স্মৃতির গোলায় কি রাখি সঞ্চয়
পুত্র প্রপৌত্র উত্তর প্রজন্মের জন্যে
রেখে যাবো কী?

আমরাতো আসলে পেয়েছি
ব্যর্থ ও ব্যর্থতার গ্লানিময় ইতিহাস
স্মৃতি-ঐশ্বর্য কিম্বা
সুখের ঐতিহ্য নয়
আমরা পেয়েছি যত ক্ষুধা-মৃত্যু-হাহাকার
অসুখ-অপুষ্টিÑ
হতাশা ও বঞ্চনার অভিশাপ
শাসকের শোষকের প্রতারণা
স্বৈরÑনিষ্পেষণ!

হতভাগ্য আমরা নির্বাক সমষ্টি নির্বোধ
কি দেবো ওদের উত্তরাধিকার
কি রাখি সঞ্চয়?
ফাল্গুনী রাতের আলো আধাঁরিতে
-স্বপন দেলওয়ার

তোমাকে দেখেছি আবার ফাল্গুনী রাতের আলো আঁধারিতে
চারপাশে ঘিরে ছিলো মায়ারহস্যের সগুচ্ছ বিন্যাস
আড়াল ভেদ করবার আকাঙ্খা আমার পঙ্গু হয়ে ফেরে
পরিপার্শ্বের না যাক গোচরে এই ছিলো অভিপ্রায়

চকিতে চেয়ে বারবার পর্দার বুকে ফের চেয়ে থাকা
অর্থহীন দৃশ্যাবলী ছাপিয়ে যখন প্রস্ফুটিত তনুশ্রী
তোমার রেডিয়্যান্ট মুখবারবার মনে হয় চীৎকারে বলি
“জ্বালাও বাতি এক্ষুনি ভালো কোরো দেখে নিতে চাই
দৃষ্টি ও চেতনার মরুভূমি ভিজে যাক শীতল বৃষ্টিতে”
দু’জোড়া চোখের একান্ত টানেলে উদ্বাহু আলিঙ্গনে বেঁধে
মুহূর্তেই বলে ফেলি হৃদয় উজাড় করা আদরে চুম্বনে
আমার ভাবনা-স্বপ্ন-কল্পনা আর ফুটন্ত কাঁঠাল চাঁপার
সুঘ্রাণে আকুল অনুসন্ধানী চোখ আর চেতনায জমে থাকা
হাজারো কবিতার কথামনে হলো তুমিতো জানোই কেয়া
বারবার চোখে চোখ মিলে গেলে একটি রেখায় হৃদয় মেলেনা?

আমাদের মাঝখানে আলো আঁধারির পাথর দেয়াল দাঁড়িয়েছে
ব্যবধান হোয়ে অচল অনড় তাই কখনো পাইনা তোমাকে
এবং আমি দিকদিশাহীন উদ্ভ্রান্তের মতো তোমার বলয়ে ঘুরি…

শুনেছি মেয়েরা খুব সহজেই বুঝে নেয় মনের গোপন কথা
সত্য যদি একবার বলে দাও লাবণ্যময়ী, ভাবে ও ভাষায়
শুকনো শূন্য বিল শ্রাবণী বৃষ্টিতে ভাসুক স্বপ্ন বাস্তবতায়

 

সংকল্প
-স্বপন দেলওয়ার

আমি সেই চিরন্তন স্বপ্নের বীজ
সমষ্টির জরায়ুতে রেখে যাবো
সেই অশ্র“ স্বেদ আর রক্তের রঙে
দীর্ণ হরফগুলো নতুনত্বে নির্মাণ করবো
সেই অবশ্যম্ভাবী লড়াইয়ের ঘোষণা
নিস্পৃহ নির্বিকার দেবো কঠিন কর্কশ স্বরে
তোমাদের ধ্বংসের অনিবার্যতার জন্য
নির্ভেজাল সভ্যতার চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠায়
আমি রেখে যাবো সংগ্রামের মন্ত্র
আপোষহীন যুদ্ধের যাবতীয় হাতিয়ার
আদি বিদ্রোহী দুঃসাহসী প্রতিবাদী
আমি স্বপ্ন আকাঙ্খার প্লাবনে ডোবাবো
তোমাদের পাপাচারে আকাশচুম্বি পর্বত

প্রস্তুত হও শত্র“র দল, ক্ষমা নেই
তোমাদের বিনাশ জানি আমার বাজিতেই

 

নারী ও রমণীটি
-স্বপন দেলওয়ার

নারী আর রমণীটি ভিন্ন ঘরে থাকে
মায়ের মায়ার ছোঁয়াÑঅকারণ ছলছল চোখ
যখোন তখোন
ব্যবধান বুকে মেলে তাপিত শূন্যতা
এমন কোথায় আর অনিন্দ্য প্রশ্রয়
তোমার সমস্ত আশ্রয়
এই পৃথিবীর
বিকাশমান উদ্ভিদের পত্রপল্লবে
উদ্বেগাকুল বিজ্ঞানী চোখ
শ্রান্তিক্লান্তিহীন সুখের নি:শ্বাস
অমূর্ত নারী এক এরকম সুরভী ছড়ায়
আর কিনা রমণীটি শরীরি ইশারায়
আচম্বিত গ্রেফতার করে
বারবণিতার হাত বাড়ায় মদের পেয়ালা
নেশা নেশা স্বপ্ন টানে
ঘুমঘোর মৃত্যু আনে ভোগ উপভোগ বাসনায়
আবেশ বলয় তার সাধ্য কার ভাঙ্গে
রোমে রোমে কোষে কোষে প্রত্যন্ত শরীরে
মাংসল চৌম্বক বিস্তারিত…

নারীর আশ্রয়ে যাও রমণী অবাস্তব
বুকে তুলে নিলে তাকে নিখোঁজ নারীও
নারী আর রমণীটি ভিন্ন ঘরে থাকে
নারীটি রমণী নয় রমণী যদিও নারীরা

 

কেন যাবো তার কাছে
-স্বপন দেলওয়ার
কেন যাবো তার কাছে
ভাসমান স্বপ্নকমল আমার পায়ের প্রান্তে
থামতে পারেনা এসে?

অখ্যাত উদ্যানে কোনদিন
স্বর্গের পারিজাত ফুটতেই পারেনা?
কেন যাবো তার কাছে
অগ্নিবৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ভস্ম হয়ে যাই
তবুও যাবো না

অরণ্যে শোনা যায় ঐ হিংস্র হাঁকডাক
পশু ও পাইথনের পেটে যাচ্ছে
হৃদপিন্ড আমার
মগজÑলিভার চোখ ঘূণ খাওয়া হাড়গোড়
সমস্ত আমাকে গিলে থাবে খাক
কিছুতেই যাবোনা তবুও

কেন যাবো তার কাছে|
কেন তুমি ডাক দিলে
-স্বপন দেলওয়ার

কেন তুমি ডাক দিলে বিবর্ণ প্রভাতে
আচানক উদিত আমার নিজস্ব বলয়ে

একান্ত দুঃখসুখ ভাবনা-স্মৃতি নিয়ে
আমিতো ছিলাম বেশ নিজস্ব জগতে
কেন তুমি টোকা দিলে বন্ধ এ দুয়ারে

কেন তুমি ডাক দিলে বিষণœ দুপুরে
জাগালে প্রবল ঢেউ নির্লিপ্ত হৃদয়ে

নিজেকে অভ্যস্ত কোরে নির্জীব আঁধারে
আমি তো ছিলাম ভালো দুঃস্বপ্ন নিদ্রাতে
কেন তুমি শীষ দিলে নিঃসাড় চেতনে

কেন তুমি ডাক দিলে বিপন্ন প্রদোষে
হতাশায় আশা আর হারাবার ভয় জাগালে

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com