বুধবার  ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ১৭ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

সুনাই, যে নদী ঝর্ণার বোন…/ নদী পর্ব ৭৮

আসামের পাহাড়ি অঞ্চলের অজস্র বৃষ্টিপাত ঝর্ণাধারায় গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসে আমাদের দেশে। স্বচ্ছজলের নহরে এসব নদী অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। নদীগর্ভ এবং তীরবর্তী সম্পদের বিভায় এরা সমৃদ্ধ। সুনাই বা বরদাল তেমনই বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। সুনাই বাংলাদেশ সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায় প্রবাহিত। বাংলাদেশ অংশে সরকারী হিসাব মতে এই নদীর দৈর্ঘ্য ৪৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৮১ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার।

বৃহত্তর সিলেটের জলঢুপ ছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। এখানকার প্রকৃতি আর ফলজ সম্পদের খ্যাতি ছিল বিশ্বময়। জলঢুপ ভেঙ্গে আজকের বিয়ানীবাজার ও বড়লেখা। সোনাই নদীই এই দুই আলোকোজ্জ্বল জনপদের লুকায়িত সৌকর্য। সুনাই-বরদল নদী ভারতের আসামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি লাভ করে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং ঐ উপজেলায় প্রবাহিত হয়ে কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে। নদীটির প্রবাহপথে বড়লেখা উপজেলা অবস্থিত। বড়লেখা ও বিয়ানীবাজার উপজেলার সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং সেই কারণে বলা যায় এটি সিলেট জেলা ও মৌলভীবাজার জেলাকে পৃথক করেছে।

একই নদীর একাদিক নাম আমাদের দেশে খুবই প্রচলিত বিষয়। সেক্ষেত্রে সুনাই নদীর বরদল নামের তেমন চমক নেই। কাগজপত্রে বরদল যুক্ত থাকলেও সুনাই নামেই এই নদীর পরিচয় নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ। একসময় এ নদী দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নৌযান চলাচল করত। বছরজুড়ে চলত লঞ্চ ও স্টিমার। কিন্তু বর্তমানে শুকনো মৌসুমে এখানে নৌকাও চলে না। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পলি জমে নদীটির এ করুণ দশা। স্থানীয়রা জানান, পানি না থাকায় নদীনির্ভর অন্তত দুই হাজার জেলে অনেক আগেই তাদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে এখনো মাছ ধরছেন। তবে মাছ যা মিলছে, তাতে পুরোপুরি এ পেশার ওপর নির্ভর করা যাচ্ছে না।

শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে সেচ নিয়ে সংকটে পড়ছেন নদীটির আশপাশের দুই থেকে আড়াই হাজার কৃষক।শুকনো মৌসুমে নদীটি মৃতপ্রায় হলেও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে বর্ষার সময়। অল্প বৃষ্টিতেই দুই পাড় উপচে তলিয়ে যায় আশপাশের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের মাঠ, দেখা দেয় ভাঙন। আতঙ্কে থাকেন দুইতীরের অধিবাসীরা। বিশেষ চাপ পড়ে বর্মি ও নিজ বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ২০ গ্রামের উপর। সুনাই এখানে চরম নির্মম। ঢলের পলি জমে জমে শুষ্ক মৌসুমে সুনাই হয়ে পড়ে স্থবির ও গতিহীন। পলি অপসারণ চালু না করলে এই নদী ঢলের ধকল সামলাতে সক্ষম হবে না।

মৌলভীবাজারের ছয়টি নদীর অন্যতম সুনাই। বড়লেখার নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে। মিলিত হবার আগ পর্যন্ত দুই তীরে জমিয়ে রেখেছে অজস্র সুন্দরের হাতছানি। পলির পরল স্নিগ্ধতা আর মধুময় মোমের ঝিলিক। জলঢুপি আনারস আর ভুবনমোহন আগরের চাষ সুনাই নদীর তীর ছাড়া আর কোথাও সম্ভব নয়। এখানেই দেশের সর্ববৃহৎ ঝর্না মাধবকুণ্ড। মাধবের জলে সুনাই নদীর শীতলতা অথবা সুনাইর শীতল জলেরা উড়ে গিয়ে মাধবে নেমে আসে জলের জীবনচক্রে এমনই তো হবার কথা।
Jamil Jahangir
নদী পর্ব ৭৮/ সুনাই, যে নদী ঝর্ণার বোন…

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত *

*

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com