সোমবার  ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ  |  ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ  |  ২৯শে সফর, ১৪৪৪ হিজরি

সবুজ বাগান কালো ক্রীতদাস

জামিল জাহাঙ্গীর, বার্তা সম্পাদক, বাংলাবাজার নিউজ

চা শিল্পের উন্নতি হলেও বদলাচ্ছে না চা শ্রমিকদের জীবন। আধুনা শ্রম দাসরা শোষনের শিকার হয়ে আসছে ব্রিটিশ আমল থেকে আজঅব্দি। চা শ্রমিক নেতারা মা‌লিক‌দের প‌কে‌টের লোক। তাই এত শোষন।

সারা‌দিন কাজের পর একজন চা শ্রমিকের আয় হয় ১২০ টাকা। দ্রব্যমুল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও সেভাবে বাড়েনা তাদের বেতন। নেই নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক জাতিগত পরিচয়। লেখাপড়ার সুযোগ নেই। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। রয়েছে চিকিৎসার অভাব। কাজ করতে গিয়ে অঙ্গহানি ঘটলেও কোনো সাহায্য নেই। ৭ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতরভাবে বসবাস করতে হয়। ৫-৬ সদস্যের অনেক পরিবার আছে যেখানে ১ জন কাজ পাচ্ছে ১২০ টাকা আর বাকিরা এই টাকার উপর নির্ভর করেই দিন পাড়ি দিতে হয়। ছোট ভাঙাচোরা ঘরে থাকতে হয় গবাদি পশুসহ সন্তানদের নিয়ে। বাগান কর্তৃপক্ষের ঘর মেরামত করে দেয়ার কথা থাকলেও তা হয় না বছরের পর বছর। তাদের নেই নিজস্ব কোনো জায়গা। বাগানে কাজ না করলে থাকার জায়গা হারানোর ভয়। এভাবে নানা বঞ্চনা দু:খ্য দূর্দশার মধ্যে কাটছে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের জীবন। এবার তারা আ‌ন্দোলন কর‌ছে মজু‌রির দা‌বি‌তে।

চা বাগানের সুন্দর ছবি দেখে আমরা বরাবরই মুগ্ধ বিমোহিত। চা শ্রমিক আর প্রাকৃতিক সুন্দর নিয়ে আমাদের কল্পনাবিলাসী মন হয়ে উঠে ঝরঝরে তরতাজা। চায়ের সুঘ্রাণ পান করার আগেই আমাদের পৌঁছে দেয় সবুজের সমারোহে সাবলীল ভঙ্গিমায়। কিন্তু এর অন্তরালে রয়ে গেছে প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস। ক্রীতদাস জীবনের গল্পকে হার মানানো এক গভীর গল্প লুকিয়ে আছে বাস্তবের পোশাকে। আইস টি, গ্রিন টি, মিল্ক টি – ব্ল্যাক টি কতো নামেই তো আমরা চা পান করি। কিন্তু নার্সারি থেকে পরিশোধনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় যারা শ্রম দেয়, তাঁদের জীবনের গল্প প্রান্তিক পানকারীদের কাছে অজানাই থেকে যায়।

কী তাঁদের দুঃখ ! কী তাঁদের কষ্ট ! কী তাঁদের যন্ত্রণা !! জীবনের মধু তাঁরা কোথা থেকে পায় ? কী খায় ? কোথায় থাকে ? কেমন শিক্ষা লাভ করে ? বিনোদন পায় কেমন করে ? এসব জানতে দেখতে সম্প্রতি (ঈদ উল ফিতরের পর) বৃহত্তর সিলেটের শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া , জুড়ি, বড়লেখা এবং হবিগঞ্জের বেশ কয়েকটি বাগানে প্রবেশ করি। চমৎকার প্রাকৃতিক সুন্দরের পাশে বিসদৃশ দারিিরিপীড়িত শ্রমিকদের দেখে চমকে উঠলাম !! প্রাচুর্য আর দারিদ্রের ভয়ানক সহাবস্থান !! এই কালো কালো মানুষেরা চোখ তুলে তাকাতে ভয় পাচ্ছে ক্যান !! তাঁদের প্রত্যেকের পরনে এমন ছেঁড়া খোঁড়া কাপড় ক্যান !! বাজারের শুকনো খাবার গুলো দেখে আরও চমকে যাবার দশা। এক এক করে লোকজন অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছে কোথায় !!! বিস্ময় এর পর বিস্ময় নিয়ে এগুতে থাকলাম ।

চা বাগানের সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় দেড় যুগের। কলেজে উঠেই বন্ধু পেয়েছি বাগান ম্যানেজারের ছেলেকে। মনে পড়ে ১৯৯৭ সালে প্রথম তেলিয়াপাড়া টি এস্টেটে যাই। আমার বন্ধুদের পরিবার আগে ওখানে স্থায়ীভাবে থাকতো- তাই ওখানের সবই ছিল ওর জানা। আমরা তখন ফাস্টইয়ারে পড়ি … কদিন পর সেকেন্ড ইয়ারে যাবো – গিয়ার কিছুতেই নামতে চায় না। সেই সময় চা বাগান আমার কাছে অভিজাত জীবনের অংশ মনে হয়েছিল। মুগ্ধতা নিয়ে অনেক কাল কাটিয়ে দেয়া যায়। সত্য ও সুন্দর না জানলেও জীবন কেটেই যায়। জানা ও চেনা কেবল অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ের বিষয়। আমি তাই টুকটাক গল্পের মতো করে শোনা আরেক পৃষ্ঠার লেখাগুলো পড়তে আগ্রহী হলাম। যদিও তিন দিন চায়ের গন্ধে ছিলাম । আমি মানুষ দেখতে চেয়েছি শুধু।

চা-গাছ বছরের পর বছর যত্ন করে কুঁড়ি থেকে বড় করে তোলেন চা শ্রমিকরা। পাতা ছেঁড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিশোধিত চা দেশ-বিদেশে পাঠানোর সিংহভাগ কৃতিত্ব তাঁদের। অথচ সেই শোধনকৃত চা পানের আর্থিক সংগতি নেই চা শ্রমিকদের। টাকা দিয়ে চা কিনে খাবে এটা তাঁদের কাছে এখনো বিস্ময় ! বেশ কয়েকটি চা বাগানে অবস্থিত শ্রমিকদের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, তাঁরা বাগান থেকে ছিঁড়ে কাঁচা চা পাতা লবণ-পানিতে গুলে তা পান করছেন। পরিশোধিত চা খেতে নয়, তা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই ভগবান তাঁদের জন্ম দিয়েছেন ।

সপ্তায় একদিন তাঁদের মজুরী দেয়া হয় ১২০ টাকা। বাগানভেদে বুধ বা বৃহস্পতি বারে তাঁদের হাতে টাকা আসে। এক এক জন শ্রমিকের জন্য নির্ধারিত মজুরী ১২০ টাকা। এক জন বাগান ম্যানেজারকে এর কারন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, আগে ৪৯ টাকা হতে ৬৯ টাকা হয়েছে। তারপর একলাফে ১২০ টাকা হয়েছে সম্প্রতি। এরসঙ্গে তাঁদের রেশন দেয়া হয়। কী কী রেশন দেয়া হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন তিন টাকা কেজিতে চাল আর সাত টাকায় ডাল দেয়া হয়। তাঁদের ঘর তুলে দেয়া হয়, আবাসনের পুরোটাই বাগান কতৃপক্ষ তদারক করেন। কিন্তু এক শ্রমিকের সাথে কোথা বলে জানা গেল অন্য খবর ! বাগান মালিকেরা তাঁদের যে রেশন দেয় তাতে করে বড় জোর একবেলা খাওয়া চলে। বাকি দুইবেলা তাঁদের বুনো শাক সবজির সাহায্যে চলতে হয়। বহিরাগত দের কাছে এই সবজি খুব মজাদার হলেও দিনে দুইবেলা করে এটা খাওয়া খুব কষ্টের। একজন জানান, দিনে একবেলা খেতেই পান না, এ সমস্যা এর নিজের । কেন এই কাজ করার অনিহা সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

বাগানের মধ্যে হাসপাতাল রয়েছে। তা সাইনবোর্ডসর্বস্ব। ডাক্তার-ওষুুধ কোনোটাই পাওয়া যায় না। অধিকাংশ সময় হাসপাতাল তালাবদ্ধ থাকে। ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারী কাউকে সার্বক্ষণিক নিয়োগ দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে চা শ্রমিকদের। বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়াকে তাঁরা নিয়তি হিসেবে মেনে নেন। খুব সহজে শ্রমিকেরা ডাক্তারের কাছে যেতেও চান না। ডাক্তার সম্পর্কে তাঁদের রয়েছে প্রচ্ছন্ন ভয়। যাকে অমুলক বলে উড়িয়ে দেয়ারও উপায় থাকে না। কথিত আছে প্রথম দিকে যখন এই অবাঙ্গালী শ্রমিকদের এখানে আনা হয় তখন তাঁরা এখান থেকে পালাতে চেষ্টা করে। বাগান মালিকেরা তখন তাঁদের রেল ষ্টেশন কিংবা নদীবন্দর থেকে ধরে এনে হাসপাতালে চেতনানাশক ইনজেকশন পুশ করে দিতো। এরপর তাঁরা কখনোই ডাক্তারদের বিশ্বাস করতে পারেনি।

হবিগঞ্জ মৌলভীবাজার ও সিলেটের কয়েকটি চা বাগানে শ্রমিকদের বাসস্থানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাঁরা। চুক্তি কিংবা খাতাপত্রে শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্যের প্রথম শর্ত হিসেবে একটি পরিকল্পিত বাসস্থান নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও নেই কোথাও। ছন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারকে। ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরে বসে থেকেও তাঁদের ভিজতে হয়। টিনের চাল দিলে আর এ অসুবিধা হতো না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, স্ত্রীসহ তাঁর পরিবারের সদস্য সাতজন। অথচ চা বাগান মালিকপক্ষ থেকে যে ঘর তুলে দেওয়া হয়েছে সেখানে দুই থেকে তিনজন বসবাস করতে পারেন। বাকিরা ঘরের বাইরে ঘুমান।

শুধু বাসস্থানই নয়, চা বাগানে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। ফলে তাঁদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নানা রোগশোকে ভোগেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক প্রচারনা ও সচেতনতামুলক কাজ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ইউনিয়নের সঙ্গে মালিক পক্ষের চমৎকার বোঝাপড়া আছে। সভা সেমিনার সিম্পজিয়ামে বক্তৃতা বিবৃতিতে তারা যা বলেন। মালিক কিংবা প্রশাসনের সঙ্গে তারা এর উল্টোটাই করেন।

প্রকৃতপক্ষে প্রশাসন ও বাগান মালিকদের কাছে চা শ্রমিকরা মানুষ কি না সেটা স্পষ্ট নয় । তা নাহলে শ্রমিকদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হতো না । আইন অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য প্রতিটি পরিবারে একটি টিউবওয়েল বসানোর কথা। অথচ পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে শহরের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় পানির অভাবে গোসল করা যায় না। টয়লেট ব্যবহার না করেই কাজে চলে যেতে হয়। কয়েকটি চা বাগানে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এক কলসি বিশুদ্ধ পানির জন্য তাঁদের সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে লাইনে দাঁড়াতে হয়।

চা শ্রমিকদের ছেলে-মেয়েদের জন্য শিক্ষার কোন বন্দোবস্ত চোখে পড়ে নি ! বাগান মালিকের প্রতিনিধি ম্যানেজার জানালেন স্কুল আছে, কিন্তু ওরা সেখানে পড়তে অনাগ্রহী ! স্কুলের অবকাঠামো দেখতে চাইলে সুকৌশলে এড়িয়ে যান। বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্য একেবারেই বিপরীত। খাবারের যোগান ঠিক নেই, পরনে ছেঁড়া কাপড়, ঝুপড়ির গাদাগাদি জীবন যাদের তাঁদের পড়া লেখা স্বপ্নের অনেক সামনে। তাই মালিকেরা ভগবান হয়ে তাঁদের ভাগ্য নির্ধারণ করেন ১৮৭ বছর ধরে। এরা জানে না শিক্ষা তাঁদের কি পরিবর্তন এনে দিতে পারে। তবে এর মধ্যেও দু একটি পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়তে যায়। তাঁদের সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক জীবনের মানুষেরা যে আচরণ করেন তা শুনলেও গা শিহরিয়ে যায়।

লছমি নামের এক শ্রমিক কন্যা জানালেন তাঁর দুঃখের কথা- স্কুলে তাঁকে পেছনের বেঞ্চে বসতে দিতেও চায় নি শিক্ষক। ময়লা কাপড় পরার অজুহাতে তাঁকে বের করে দিয়েছে । কাঁদতে কাঁদতে – তাঁর একটাই কথা – ‘ এমন বিদ্যা হামার নাগবি না – বাবু। এই বাবু সম্বোধন করে তারা বাইরের লোকের জন্য। সাদা চামড়ার লোক দেখলে এরা এখনো ভগবানের লোক ভাবে। ভয় পায়। তাঁদের বিশ্বাস এই ভগবানদের সাহায্যের জন্যই তাঁদের জন্ম। তাই স্কুলে না গিয়ে বাল্যকালেই তারা শিখে নেয় বাগানদাসের কাজ। চারার পরিচর্যা। পাহাড়ের ঘাস পরিস্কার। গাছে চুন দেয়া। নার্সারির শেড মেরামত। নালা নর্দমা পরিস্কার। চা তোলা। পাতার ড্রাই । কিংবা প্যাকেট জাত করা। এর সাথে বাগান বাবুদের প্রয়োজনে যে কোন কাজ!

যে কোন কাজ ! এরপর আশ্চর্যবোধক চিহ্ন দেখে কেউ ভড়কে যেতে পারেন। কিন্তু ভড়কানোর কিছু নেই। বাগান প্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্য তাঁদের অনেক কিছুই করতে হয়। বাগানের কাজে নিরন্তর নিয়োজিত নারীদের গায়ের রঙ যাই হোক না কেন, কারো কারো জন্য তারা বিরল লোভের আফিম। তাই তাঁদের অনেক কিছু শুনতে হয়। শুতে হয় অচেনা অজানা দু একদিনের ঢু মারা পুরুষের সাথে। নারী শ্রমিকদের এই পরিণতি পুরুষদের ভয়ানক বেখেয়ালী করে জীবন থেকে।

তবে মদ তাঁদের জীবনে সহজলভ্য বস্তু হিসেবে ধরা দিয়েছে। হাত বাড়ালে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন নাম ও স্বাদের মদ পেতে তাঁদের কোনো কষ্ট করতে হয় না। কান্ট্রি লিকার (দেশীয় বাংলা মদ), হারিয়া ও লাংগীতে বুঁদ হয়ে অনেক রাত-অবধি জেগে থাকেন চা শ্রমিকরা।এর ওপর প্রতিদিন এক-আধটু মদ পান না করলে ঠিকমতো ঘুম হয় না। সন্ধ্যা হলে রক্তে এমন টান দেয় তখন পেটে দু-এক গ্লাস মদ না পড়লে অস্থির ভাব জাগে। তখন ছুটে যেতে হয় পাট্টায় (মদের দোকান)। দুই তিন গ্লাস খেয়ে এরপর মাতলামি। বাঁকা রাস্তাকে সোজা করার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত টানাটানি কিংবা সোজা ব্রিজকে বাকিয়ে নিজের বস্তির দিকে নিয়ে যাবার অহেতুক প্রচেষ্টা … অশ্রাব্য অভব্য গালিগালাজ এখানকার নিত্য দিনের নামতা। ‘সন্ধ্যার পর বাগান এলাকা যে কোন মানুষের জন্য নিরাপদ নয়’– এটা বাগান মালিকদের দেখানো প্রচ্ছন্ন ভয়। যার মাধ্যমে বাগানের অমানবিক অংশকে ঢেকে রাখা হয়। পুঁজিপতি আর তাদের পালিত মাস্তানদের নিয়ে পুরো প্রশাসন কব্জা করে তারা এই আধিপত্য চালিয়ে আসছে। এখানে সরকার ও ভগবান একজনই – যারা বাগান মালিক ।

বাগানের বিনোদন বলতে এই মদই একমাত্র মাধ্যম- এখানে কেউ কোনোদিন টিভি দেখেনি, সিনেমার নাম শুনেনি। নিজেদের উঠানামার জীবনের সাথে মিল রেখে পাহাড়ের কম্পন সঙ্গী করে তাঁরা গুন গুন করে কিছু গায়! গান ভেবে মর্মোদ্ধার করতে গিয়ে শুনি – বুকের গভীরে জমা রক্তের নীল রঙ সাদা হয়ে যাওয়া অদ্ভুত জীব পদাবলী !! ‘একদিন তাঁর সুন্দর ঘর ছিল- তাঁকে বলা হল- আরও সুন্দর তাঁকে দেয়া হবে- কিন্তু ঘর তো নেই লোকে তাঁর বিছা নিয়ে টানাটানি করে। আগে তাঁর অনেক অনেক রুটি ছিল সে শুকিয়ে শুকিয়ে জমা করতো- এখন সে রুটিই পায় না – শুকাবে কেমন করে !’ রক্ত হিম হয়ে যাওয়া বাণী আর মর্ম ছিঁড়ে যাওয়া সুরে যেন অবিরাম কান্না – হাওরের আফালের মতো দাপিয়ে বেড়ায় জীবন। ‘ আমি কেমন করে জঙ্গলে এলাম, কী চেয়েছিলাম রে কী এখানে পেলাম !!”– এখানে অগুনতি টাকা উড়ে বলে – গুজব তৈরি করে ব্রিটিশ বেনিয়ারা তাঁদের এখানে নিয়ে আসে। তারপর জোর করে তাঁদের বাগানের ভেতর বন্দী করা হয়। আশেপাশের রেল বা নদী বন্দরে পালিয়ে গেলে তাঁদের গুলি করে ভয় দেখানো হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ১৮৭ বছর তাঁরা এখানেই আছে একইভাবে বংশ পরম্পরায়। তাঁদের ভাগ্য এখনো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছেনি !

জন্ম থেকে মৃত্যু, বিয়েশাদি থেকে পূজা-উৎসবের প্রতিটি পর্বে মদকে প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন চা শ্রমিকরা। চা বাগানের ইতিহাসের সঙ্গে মাদকের এ অধ্যায়কে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সঙ্গে তুলনা করে(নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এক বর্ষীয়ান চা শ্রমিক বলেন, চা বাগানে ব্রিটিশ বেনিয়াদের ষড়যন্ত্রে মদ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। শ্রমিকদের মদে বুঁদ করে রাখা হতো মূলত দাবিদাওয়ার জন্য, যাতে আন্দোলন করতে না পারে, যাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে জন্য।

অভিযোগ রয়েছে বর্তমানে চা বাগানে কিছু চা শ্রমিক নেতা, চা বাগান মালিক ও প্রশাসনের যোগসাজশে মাদক-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের সব চা বাগানে ৯০ শতাংশ শ্রমিক মাদকাসক্ত। এ কথা শ্রমিকরাও নির্দি্বধায় স্বীকার করেন। অধিকাংশ চা শ্রমিক মদপান করলেও মানসিকভাবে তারা মাদকের বিরুদ্ধে। তাদের মাদক ব্যবহার করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ বানিয়ে শ্রমিকদের মানসিকতাকে আন্দোলনবিমুখ করে রাখার জন্যই চা বাগানে অবাধে মাদক ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। এ দেশে বিভিন্ন সেক্টরে লাখ লাখ শ্রমিক রয়েছে; অথচ সেখানে কোনো মদের লাইসেন্স-পারমিট নেই। শুধু চা শ্রমিকদের বেলায় কেন মাদক বৈধ করা হয়েছে এই প্রশ্নের নেই কোন উত্তর !!

অতীতে চা শ্রমিকদের মধ্য থেকে অনেক বিখ্যাত লোকের জন্ম হয়েছিল। ১৯৩৫ সালে চা শ্রমিক নেতা দ্বারিকানাথ তেওয়ারী এবং ১৯৪৬ সালে জীবন সাঁওতাল এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হয়ে সেটা প্রমাণ করেছিলেন। তাদের মতো আর কোনো মেধা যাতে চা শ্রমিকদের মধ্যে জন্ম না হয়, সে জন্য চা বাগানের লাইনে লাইনে (বাসস্থান) মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দেশ থেকে ব্রিটিশরা বিতাড়িত হলেও তাদের মাদক-সংস্কৃতি চা বাগানে জিইয়ে রেখেছে বর্তমান চা বাগান মালিকরা তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য, যাতে মদে বিভোর হয়ে শ্রমিকরা দাস হিসেবে থাকেন।

চা বাগান শ্রমিকদের ইতিহাস মানে বঞ্চনার ইতিহাস। তাঁদের ১৮৭ বছর ধরে সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ শ্রমিকই জানেন না তাঁদের ন্যায্য অধিকার কী। অন্যদিকে বাইরের কোনো সংগঠনকে চা বাগানের ভেতর কাজ করতে দেওয়া হয় না। এমনকি এনজিওর কর্মীদের চা বাগানে ঢুকতে গেলে পূর্বানুমতি লাগে। ফলে বাগানের শ্রমিকরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পিছিয়ে আছেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন এক বর্ষীয়ান চা শ্রমিক । যুগ যুগ ধরে বাইরের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিককর্মীদের জন্য চা বাগান একটি নিষিদ্ধ স্থান করে রাখা হয়েছে।

চা বাগানে অবাধে সরকারি মদের প্রচলন নিয়ে সেখানে কিছু খোঁড়া যুক্তির কথাও শোনা যায়। যেমন_অতীতে বিষাক্ত মদ পান করে কলেরার মতো মহামারিও দেখা দেয় চা বাগানে। কারণ হারিয়া, লাংগি, চুয়ানি কিংবা চোলাই মদ তৈরির জন্য পচা ভাত, নিকৃষ্ট গুড়, নিশাদল, ইউরিয়া সার, তুঁতে থেকে শুরু করে তোলাপোকা ও টিকটিকির লেজ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। যে কারণে এসব মদ পান করে চা শ্রমিকরা কলেরা, লিভার সিরোসিস, আমাশয়, কিডনি রোগ, পা ফোলাসহ নানা রোগে অকালে প্রাণ হারাতেন। ষাটের দশকের শুরুতে বিষাক্ত মদ পান করে সিলেট অঞ্চলের চা বাগানে কয়েক হাজার শ্রমিক মারা যান। যে কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শ্রমিকদের জীবন বাঁচানোর জন্য সরকারিভাবে বিশুদ্ধ দেশীয় বাংলা মদের পাট্টা (লাইসেন্স) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে চা শ্রমিক নেতারা একে আরেক ধরনের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, অবৈধ মাদককে বৈধ করে সরকার চা শ্রমিকদের সারা জীবন মাদকাসক্ত করে রাখতে চায়।

চা শ্রমিক ও চা শিল্প সংশ্লিষ্ট গবেষক ও গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায় , সহজ-সরল শ্রমিকদের শোষণ করে বাগানের মালিকরা বর্তমানে কোটিপতি ও শিল্পপতি। আরও অবাক হবার মতো তথ্য, একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৮০ কেজি কাঁচাপাতা তুলতে পারেন। যা থেকে ২৮ কেজি পরিশোধিত চা পাওয়া যায়। এ চা দেশে-বিদেশে বিক্রি করে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করেন বাগানের মালিকরা। অথচ এক দিনে এ চা সংগ্রহ করে প্রত্যেক শ্রমিক মজুরি পান মাত্র ১২০ টাকা করে। হিসাবের এ মারপ্যাঁচ চা শ্রমিকদের পক্ষে বোঝা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একজন চা শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুখে মুখে তাঁদের শ্রমিক বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁরা বাগানের দাস।

মাদক শুধু চা শ্রমিকদের জীবন কলুষিত করছে না, বাইরে থেকে দলে দলে যুবসমাজ এসে তাঁদের সঙ্গে মদ পানে অংশ নিচ্ছে। বাইরের লোকেরা বাগানে আসে আমোদ ফুর্তি করতেই বাগানে আসে। পাট্টায় ওরা শ্রমিকদের সঙ্গে বেয়াদবি করে ! বয়সে বড়দের তুইতোকারি করে আদেশ করে। অযথা বিশৃঙ্খলা বাঁধায়। মাঝেমাঝে মারামারিও করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় স্থানীয় মাদকাসক্ত তরুণেরা নিরাপদে নেশা গ্রহণের জন্য চা বাগানকেই বেচে নেন। এরা দল ও বলের দিক দিয়ে রাজনৈতিকদের চেয়ে ভারী। মন্ত্রীর চেয়েও তারা ক্ষমতাবান। মালিক আর শ্রমিকদের মাঝখানে জীবন চুরি করে যাচ্ছে -গাঁজা, ভাং, চরস, ফেন্সিডিল ইয়াবা এরাই চা বাগানে নিয়ে আসে।

বাগান দাসেরা এসব খায় না । এসব কেনার সাধ্য তাঁদের নেই।তাঁদের কাছে একটাই নেশা সে হল মদ। সামান্য দু তিন গ্লাস হলেই তাঁর নেশা হয়ে যায়। এরপর কেনার সঙ্গতি নেই কাররই। কেননা তাঁদের মজুরীর টাকা চলে যায় খাওয়ায় ও পুরনো কাপড়ে। বাদবাকি ৪৫ টাকা তিন গ্লাস মদের হিসেব। পাট্টায় বাকি বলে কোন শব্দ নেই। যা খাও নগদ খাও নইলে না খেয়ে চিল্লাচিল্লি করো। শ্রমিকরা মদের নেশায় বিভোর থাকেন বলে তাঁদের কোনো সামাজিক মর্যাদাও নেই। এ পথ থেকে কখনো তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়নি। দীর্ঘদিনের পুরনো এ অচলায়তন ভাঙতে না পারলে চা শ্রমিকরা চিরদিন দাস হয়েই থাকবেন, মানুষ হতে পারবেন না। বাইরের ভূমিপুত্ররা বাগান থেকে বের হলেই ভদ্র ও সভ্য হয়ে যায়, কিন্তু এই কালো কালো মানুষেরা বয়ে বেড়ায় এইসব ক্ষতচিহ্ন জন্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চা বাগানগুলোতে মাসে প্রায় তিন লাখ লিটার সরকারি মদ সরবরাহ করা হলেও অবৈধ হারিয়া কিংবা লাংগির কী পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে জানা যায়, সরকারি মদের প্রায় তিন গুণ বেশি স্থানীয় মদ বিক্রি হয়। শুধু মদই নয়, চা বাগানে গাঁজা, চরস ও আফিমের প্রচলন রয়েছে। কোনো উৎসব কিংবা নির্বাচনের সময় শ্রমিকরা সব ধরনের মাদক ব্যবহার করে থাকেন। যে কারণে নির্বাচনের আগে ভোটব্যাংক ঠিক রাখার জন্য প্রার্থীরা প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন_এ সময়ে যেন চা বাগানে অবৈধ মাদক উদ্ধারের জন্য কোনো অভিযান চালানো না হয়। এবং এভাবেই চলে প্রশাসন তাদের কথা মতো , রুটিনমাফিক ! জীবন এখানে বিবেচ্য বিষয় নয় ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিই আসল।

আমরা শখ করে তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলি, তাঁদের ছবি মনোরম দৃশ্য দেখে টানিয়ে রাখি শোবার ঘরে অথবা ড্রয়িংরুমে। কিন্তু তাঁদের জীবন আলেখ্য থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কালো কালো এই বাগান দাসেরা দাসই থেকে যায়- প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাঁদের মানুষ হবার কোন অধিকার নেই। আমরা কাপ কাপ চা খাই চাঙ্গা হই চনমনে হই। কিন্তু কালচে দানাদার চায়ের প্রতিটি গুড়ায় মানুষের রক্ত মিশে আছে আমরা দেখতে পাই না। হয়তো কোন দিনই আমাদের দেখা হবে না এই অভিশপ্ত জীবনের অন্দরের আহাজারি। আমরা ডিএসএলআর জুম করে চাঁদের বুড়ির মতো বাগান কন্যাদের ছবি তুলে মোহিত হবো, আর চায়ের কাপে তৃপ্তি ভরে চুমুক দিয়ে বলবো – এই তো আমাদের চা – সেরা বাগানের সেরা …

দিনের পর দিন । মাসের পর মাস । বছরের পর বছর। যুগের পর যুগ। শতাব্দির পর শতাব্দি এভাবেই পৃথিবীতে দাসেদের দাসত্তে আমরা চাঙ্গা থাকবো- আর রাজপথে মিছিলে স্লোগান তুলবো। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই- ঘরে গেলেই ভুলে যাবো সব। আমরা ভুল করার জন্যই এই ভুল বিচারের উপত্যকায় জন্মেছি। চা শ্রমিকদের মতো আমাদেরও মৃত্যু ভিন্ন সংশোধিত জীবনের কোন সম্ভাবনা নেই।

জামিল জাহাঙ্গীর
ঢাকা।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com