বুধবার  ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং  |  ১৩ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪৩ হিজরী

লিয়াকতই মেজর সিনহাকে গুলি করেন, দাবি প্রদীপের

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। চাঞ্চল্যকর মামলাটির রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩১ জানুয়ারি। কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে আজ বুধবার মামলার সওয়াল-জবাব (যুক্তিতর্ক) শেষে বিজ্ঞ বিচারক রায় ঘোষণার তারিখ ঘোষণা করেন।

মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীর যুক্তিতর্ক শেষে দুপুর ১টার দিকে আদালতের বিচারক মামলার রায়ের এই তারিখ ধার্য করেন বলে জানিয়েছেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম।

আদালতের কার্যক্রম শেষে দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফিংয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান জানিয়েছেন, এই মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণে প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে মেজর (অব.) সিনহাকে হত্যা করেছেন। তাই আদালতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানানো হয়েছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে আসামি বরখাস্ত ওসি প্রদীপের পক্ষে অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত তাঁর অসমাপ্ত যুক্তিতর্ক শুরু করেন। যুক্তিতর্ক শুনানিতে ওসি প্রদীপকে সিনহা হত্যায় নির্দোষ দাবি করে খালাস প্রার্থনা করেন তাঁর আইনজীবীরা। বুধবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিন ধার্য ছিল।

আসামি বরখাস্ত ওসি প্রদীপের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত জানান, সিনহা হত্যাকাণ্ডে ওসি প্রদীপ জড়িত ছিলেন না। মামলার এভিডেন্স অনুযায়ী আসামির ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন তিনি। তিনি ওসি প্রদীপকে খালাস প্রদানের আবেদন জানান।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, মামলার গত চার দিনের টানা ধার্য তারিখে ১৫ জন আসামির আইনজীবীগণ আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। বরখাস্ত ওসি প্রদীপের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্তের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্র এবং বাদীপক্ষের আইনজীবীরা আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি খণ্ডন করেন। সর্বশেষ সওয়াল-জবাব শেষে আগামী ৩১ জানুয়ারি মামলার রায়ের দিন ধার্য করেন বিজ্ঞ বিচারক।

এদিকে সওয়াল-জবাব শেষে আদালতের কাঠগড়ায় থাকা মামলার অন্যতম আসামি বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বিজ্ঞ বিচারকের অনুমতি নিয়ে ১০ মিনিট কথা বলতে চান। এ সময় আদালত বলেন, ‘এ পর্যায়ে আসামির বলার সুযোগ নেই। বলার সুযোগ ছিল ৩৪২ ধারার কার্যক্রমের ধার্য দিনে।’

তার পরও আদালতের অনুমতি পেয়ে বরখাস্ত ওসি বলেন, ‘আমি তো মেজর সিনহাকে গুলি করিনি। লিয়াকত কর্তৃক গুলি করার খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে গুলিবিদ্ধ মেজর সিনহাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই।’

এক পর্যায়ে আদালত জানতে চান, সেদিন মেরিন ড্রাইভের ঘটনাস্থলে এপিবিএন সদস্যরা মেজর সিনহাকে দেখতে পেয়ে স্যালুট প্রদর্শন করেন কিন্তু পুলিশ তা না করে গুলি করল কেন?

আদালতের এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি প্রদীপ বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে এসে গুলি করার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী আমাকে জানান, অস্ত্র হাতে মেজর সিনহাকে দেখতে পেয়ে লিয়াকতের মনে সন্দেহ জাগে যে, তিনি (সিনহা) গুলি করবেন। এমন সন্দেহে লিয়াকতই মেজর সিনহাকে গুলি করে দেন।’

ওসি প্রদীপের এমন বক্তব্যে এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো পরিদর্শক লিয়াকত আলী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তিনিও কিছু বলার চেষ্টা করেন।

এদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে আরো অনেক লোককে হত্যার অভিযোগ প্রসঙ্গে বিজ্ঞ আদালতের প্রশ্নের জবাবে ওসি প্রদীপ বলেন, ‘ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসব করা হয়েছে।’

পিপি অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, মামলার বিচারিক কার্যক্রমের আট দফায় গত ৭ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন, জেরা শেষ হয়েছে। মোট ৬৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আসামিদের ৫-৭ ডিসেম্বর বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। একই সাথে ৯ জানুয়ারি (রবিবার) থেকে গতকাল ১২ জানুয়ারি বুধবার পর্যন্ত যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

হত্যাকাণ্ডের চার দিন পর ৫ আগস্ট সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন কক্সবাজার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত  কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিতকে। আদালত মামলাটির তদন্তভার দেন কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫-কে।

৭ আগস্ট মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও ওসি প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরো মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর গত ২৪ জুন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসেন।

এ মামলায় চার মাসের বেশি সময় তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীসহ অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com