বুধবার  ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ১৮ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

যত ক্ষমতা তত সুবিধা

ম্যাচ পাতানো যদি আধুনিক ক্রিকেটের ঘৃণ্যতম অপরাধ হয় তাহলে অবৈধ বোলিং অ্যাকশন ভয়াবহ এক রোগ। আজ এই বোলার তো কাল ওই বোলারের অ্যাকশনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ রোগের সর্বশেষ শিকার বাংলাদেশ। ২০১৬ বিশ্ব টি-টোয়েন্টি আসরের মাঝপথেই নিষিদ্ধ হয়েছেন দুজন। তার আগে যুব বিশ্বকাপে একই কারণে একজন বোলার হারিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা কি আচমকাই, নাকি দীর্ঘদিনের অপচর্চারই ফল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যা জেনেছেন মাসুদ পারভেজ, তা খুবই উদ্বেগজনক। আজ পড়ুন সে অনুসন্ধানের তৃতীয় পর্ব।

‘সঞ্জিত সাহাকে আপনারা কেন নিলেন?’

গত ১০ এপ্রিল প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের ‘প্লেয়ারস বাই চয়েস’ নামের লটারিভিত্তিক দলবদল অনুষ্ঠানের বিরতিতে এই কৌতূহল নিয়েই ব্রাদার্স ইউনিয়ন শিবিরে ছুটে গেলেন কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের এক কর্মকর্তা। এরপর দুই পক্ষের বাক্যালাপ যেদিকে মোড় নিল, তাতে কান না পেতে উপায় আছে!

এই বছরেরই জানুয়ারিতে যুব বিশ্বকাপে সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নিষিদ্ধ অফস্পিনারকে নিয়ে প্রশ্নের ঢিল ছুড়ে অবশ্য বিশেষ সুবিধা করতে পারলেন না প্রশ্নকর্তা। ব্রাদার্স কর্মকর্তারা যে তাঁকে আরো বড় প্রশ্নের ঢিল ছোড়ার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। সেই ‘জায়গা’টি আসলে পুরো দলবদল অনুষ্ঠানজুড়েই ফিসফিসানি তুলে যাওয়া একটি টেবিল, যেখানে বসে আবাহনীর জন্য ক্রিকেটার বেছেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরই (বিসিবি) ছয়-ছয়জন পরিচালক!

সেই সূত্রে ক্ষমতার দাপটে অনেক কিছু আড়াল হওয়ার সম্ভাবনায় ভরসা খুঁজতে চাইলেন ব্রাদার্স কর্মকর্তাও, “আবাহনী কতজন চাকার নিয়েছে দেখেছেন! আপনি কি মনে করেছেন আম্পায়াররা ওদের বোলারদের ‘রিপোর্ট’ করবে? অবশ্যই না। ওদের যদি না করে থাকে, তাহলে আমাদের বোলার নিয়েও কিছু করবে না।” ব্রাদার্স কর্মকর্তার এতটা আশ্বস্ত হওয়ার কারণও অমূলক নয়। বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক ও আবাহনী কর্মকর্তা ইসমাইল হায়দার মল্লিক তো ২০১৩ সালের নির্বাচন করেছিলেন ব্রাদার্সের কাউন্সিলর হিসেবেই। কাজেই প্রকাশ্যে সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা এলেও আড়ালে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে অন্যায্য আনুকূল্যই আশা করে ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকা পক্ষগুলোও।

আশার কথা, নেপথ্যের এসব ব্যাপারস্যাপার নিয়ে অনেকে এখন মুখও খুলতে শুরু করে দিয়েছেন। এঁদের অন্যতম সাবেক জাতীয় কোচ জালাল আহমেদ চৌধুরীও আগাম সন্দিহান হয়ে থাকলেন আম্পায়ারিং নিয়ে, “এখন ‘চাক্কা’ বোলার কোন দলে খেলছে, সেটিও একটি ব্যাপার। ক্লাবের চাপের কারণে আম্পায়ার হয়তো তাঁকে ‘রিপোর্ট’ই করবেন না।” জালালের বক্তব্যের সত্যতাও পাওয়া যায় আম্পায়ারদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। ‘অ্যালটমেন্ট’ বাতিল হওয়ার ভয়ে যে তাঁদের অনেকেই এবার আবাহনীতে জায়গা পাওয়া চাকারদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে নারাজ। অথচ শিরোপাপ্রত্যাশী আবাহনী বেছে নিয়েছে একাধিক চাকারকে। যদিও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ হয়ে ফেরা ফাস্ট বোলার তাসকিন আহমেদের মধ্যে বড় কোনো সমস্যা নেই বলেই বিশ্বাস করে বাংলাদেশ দলও।

অথচ এই আবাহনীতে এমন একাধিক বোলারও আছেন, যাঁরা সন্দেহজনক অ্যাকশনের সমস্যা লালন করেই ঘরোয়া ক্রিকেটে পার করে দিয়েছেন বহু বছর। তাঁদের প্রশ্নবিদ্ধ অ্যাকশন নিয়ে আম্পায়াররাও কম প্রতিবেদন জমা দেননি। তবে শোধরানোর কোনো উদ্যোগ না থাকায় এঁরা সমস্যা নিয়েই দিব্যি খেলে চলেছেন। এতে চাকারদের দল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধাও হচ্ছে। গত মৌসুমে মোহামেডানের হয়ে খেলা বাঁহাতি স্পিনার অমিত কুমার নয়নকে যেমন এবার লটারি থেকে তুলে নিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী। খুলনা ও ঢাকা মেট্রোর হয়ে ১১টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলে ফেলা আরেক বাঁহাতি স্পিনার আবু বকর সিদ্দিকও (জীবন) আবাহনীতে ঠাঁই করে নিয়েছেন বহুবার সন্দেহজনক অ্যাকশনের অভিযোগ মাথায় নিয়েই।

আবাহনীর এ দুই বাঁহাতি স্পিনারকে নিয়ে যাবতীয় অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বিসিবির আম্পায়ারস কমিটির সাবেক সদস্য রিয়াজ আহমেদও, ‘আমি আম্পায়ারস কমিটিতে থাকাকালেই এরা দুজন বেশ কয়েকবার করে সন্দেহজনক অ্যাকশনের জন্য অভিযুক্ত হয়েছে। যত দূর জানি, পরেও হয়েছে। বিশেষ করে জীবন নামের ছেলেটিকে নিয়ে আম্পায়ারদের জমা দেওয়া প্রতিবেদনের সংখ্যা দশের কাছাকাছিই হবে।’ ফার্স্ট ক্লাস খেলা আবু বকরের জন্য এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ। তবে অমিতকে পোড় খাওয়াই বলা যায়। গত মৌসুমে প্রায় নিয়মিতই মোহামেডানের হয়ে নতুন বলে বোলিং করেছেন, এমনকি আবাহনীর বিপক্ষেও। খেলেছেন বিপিএলও।

ক্লাব ক্রিকেটের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত আবাহনী কর্মকর্তাদের অমিত ও আবু বকরের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহের কথা না জানার কথা নয়। বিসিবি পরিচালক, গেম ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ও আবাহনী কোচ খালেদ মাহমুদ অবশ্য দাবি করলেন যে তিনি ‘আবছা’ই জানেন, ‘আবু বকর সিদ্দিককে আমি চিনতামই না বলতে গেলে। আমি পত্রিকা পড়লেই দেখতাম যে ছেলেটা পারফর্ম করে, রান করে। আমি এমন একজন অলরাউন্ডারও খুঁজছিলাম, যে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। আর অমিতের খেলাও আমার খুবই কম দেখা হয়েছে। মোহামেডানের সঙ্গে খেলা থাকলেই কেবল ওকে দেখতাম। তবে হ্যাঁ, আমি জানি বা সবাইকে বলতে শুনি যে ওর অ্যাকশন নাকি সন্দেহজনক।’ তবু এখানে একটু সংশয় এভাবে ঝুলিয়ে রাখেন মাহমুদ, ‘কিন্তু খালি চোখে দেখে একজনের বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলে দেওয়া খুবই কঠিন।’ অবশ্য অমিতদের নজরদারির মধ্যে রাখার কথাও বললেন, “খেলছে এ বছর। সত্যিই যদি অ্যাকশনে সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে আম্পায়াররা ‘রিপোর্ট’ করবেন। এটা আবাহনী-মোহামেডান বলে কথা নয়। যে যেখানেই খেলুক, তাকে শোধরানোটাই বোর্ডের দায়িত্ব।” সেই দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ তো আবাহনীরও। দলবদলের অনুষ্ঠানই তো প্রমাণ করে দিয়েছে যে ক্রিকেট বোর্ডে এখন তাঁরাই ক্ষমতাসীন!

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com