রবিবার  ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং  |  ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

মেডিটেশন এবং ইএসপি, পর্ব-১

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গান নিশ্চয়ই আপনি শুনে থাকবেন। গানটির প্রথমকথা হলো, “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়”।

খুব সহজ শব্দ চয়ন। এই সাধারন কথামালার মধ্যে কত বড় অসাধারন, গভীর কথা লুকিয়ে আছে তা কি একবার ভেবেছেন? কে লুকিয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিয়ার বা দেহের মাঝে, যাকে তিনি এতদিন দেখতে পাননি। এই দেখতে পাওয়া কি বর্হি:দৃষ্টি অর্থাৎ চোখ দিয়ে দেখতে পাওয়া? নাকি, অন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখা। এই দেখা কি সত্য সত্যই দেখা না অনুভব করা? নোবেল বিজযী এক ঈশ্বরবাদে(ব্রক্ষ্ম ধর্মে) বিশ্বাসী রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর যে বয়সে এসে, হিয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকা বিষয়টিকে এতদিন দেখতে পাইনি বলে উপলদ্ধি করেছিলেন, আপনি কি তা কখনো উপলদ্ধি করার চেষ্টা করেছেন!
আপনি চোখ দিয়েই পড়ছেন। চোখে কোন সমস্যা হলে হয়তো চশমা পরবেন। বড় রকমের কোন সমস্যা যদি হয়েই যায়, তখন হয়তো আপনার চোখটা বদলে অন্য কারো চোখ লাগিয়ে দিবেন চিকিৎসকরা। যিনি চোখ দান করছেন তার নাম হযতো রশিদ। তাতে আপনি কিন’ রশিদ হয়ে যাবেন না। আপনি আপনিই থেকে যাবেন। জরুরী প্রয়োজনে আপনার দেহে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। অন্যের রক্ত আপনার শরীরে প্রবেশ করানো হলে, আপনি অন্য কেউ হয়ে যাবেন না। চিকিৎসা বিজ্ঞান কিডনি, লিভার সহ শরীরের অনেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বদলে অন্যেরটা লাগিয়ে দিচ্ছে। কৃত্রিম হাত, পা’সহ অনেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বানিয়ে দিচ্ছে। এমনকি যন্ত্রের হৃৎপিন্ড লাগিয়েও বেচে থাকছে মানুষ। তাতেও একজন মানুষ অন্য কেউ হয়ে যাচ্ছে না। অর্থাৎ দেহের কোন অংশই আমার বা আপনার নয়। এগুলো পৃথিবীতে চলার, বেচে থাকার ইন্সট্রুমেন্ট মাত্র। এগুলো বদলে দিলে আপনি বদলাবেন না। আপনি আপনিই থেকে যাবেন।
অনেক সময় প্রয়োজনে  মিথ্যা কথা অনেকেই বলেন। হয়তো আপনিও বলেন। প্রাণ সংশয়ে, সন্মান রক্ষায়, প্রেমে পড়ে, প্রেমিক বা প্রেমিকাকে খুশী করতে অথবা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের অর্থাৎ বসের মন যোগাতে মাঝে মধ্যে মিথ্যা না বলে উপায় থাকে না। । এই মিথ্যা কথাটা বানিয়ে দেয় আপনার ব্রেইন। ব্রেইন এই মিথ্যা কথাটা বানালেও আপনি কিন’ জানেন সেটি মিথ্যা, সত্য নয়। অর্থাৎ ব্রেইনটাও আপনি নন। অর্থাৎ আপনার পুরো দেহটিই আপনি নন। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে পাঠানোর সময় পৃথিবীতে চলার, কাজ করার উপযোগী, দেহ নামের এই পোষাকটি আপনাকে দিয়েছে। এসবের কোনটাই আপনি নন। তাহলে আপনি কে! কোথায় আছেন আপনি!
আপনি যদি আপনাকে খুঁজতে চান, তাহলে যেতে হবে, আপনার মনের কাছে। এই মনটা আপনার। কিন’ আপনি নন। আপনার ভাই খুলনায় থাকে। রাগ করে চলে গেছে  দাদার বাড়ী। আপনার মন বলছে, ভাইটা ফিরে আসবে। কে বলছে? আপনি নন। আপনার মন। মনটাও আপনি নন। তবে, কোন ফিজিক্যাল ডাইমেনশনে নেই বলেই ওটা বদলানো বা ছেঁটে ফেলা যাবে না। যন্ত্রের মনও লাগানো যাবে না। ওটা চিরদিন আপনারই থাকবে। আপনি আপনার দেহও নন। এমনকি মনও নন। তাহলে আপনি কে? আপনি যদি আপনাকে খুঁজতে চান প্রথমে ধরতে হবে আপনার মনকে। কারণ,আপনার নিজের মনটা সব সত্য জানে। সে জানে আপনার চোখটা রশিদের, কিডনীটা ইংরেজের,হৃদপিন্ডটা যন্ত্রের, কিংবা আরো কিছু। আপনার মন এও জানে যে আপনার ব্রেইন আপনাকে দিয়ে মিথ্যা কথা বলাচ্ছে, যা আপনি অবলিলায় বলছেন। অর্থাৎ মন যা জানে তার সবই সত্য। সে কখনো মিথ্যা জানে না। মন আপনার সত্যিকারের বন্ধু,আপনার দর্শন, আপনার পথ প্রদর্শক,আপনার চিকিৎসক। মন সবসময়ই সত্য।
আপনাকে সেই সত্যের কাছে যেতে হবে। যে সত্য আপনার মন । যে চেনে আপনাকে। যা আপনার হাত, পা, নাক, কান, গলা, চোখ কিংবা রক্ত, মগজ, টিস্যু, হাড়, যকৃত, প্লিহা এসব ফিজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট নয়। এসব আপনার পোষাকের অংশ মাত্র। এসব প্রয়োজনে বদলে নেয়া যায়, কেটে ফেলা যায়। আর যা কখনই মানুষ বদলে দিতে পারবে না, কেটে ফেলতে পারবে না সেটা আপনার মন । নিজেকে চিনতে হলে আপনাকে সেই মনের কাছে যেতে হবে। সেই এন দিতে পারবে আসলে আপনি কে?
এবার একটা গল্প বলি। গল্পের শুরুটা ঠাকুরমার ঝুলিতে যেমন করে হয়, এটাও তেমন। এক যে ছিল রাজা। তবে আমার গল্পে রাজা নয়, আছে সম্রাট। অনেক অনেক রাজ্য নিয়ে তার সম্রাজ্য।সম্রাটের একদিন মনে হলো, তার এতবড় সম্রাজ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরী থাকবেনা, তা হতে পারে না। যেই ভাবা সেই কাজ।  সম্রাট হুকুম দিলেন লাইব্রেরী গড়ার জন্য, পৃথিবীর যত জ্ঞানের পুস্তক রয়েছে তা যে কোন মূল্যে সংগ্রহ করার। তার নির্দেশে একটি দল বেরিয়ে পড়লো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। প্রায় বছর খানেক পর তারা যে পুস্তক সংগ্রহ করে আনলো তা একটা ছোট খাটো পাহাড়ের সমান। এবার সম্রাট এতসব পুস্তক থেকে জ্ঞান আহরণ করতে চাইলেন। তারও এত সময় নেই সবগুলো বই পড়ার, তাই তিনি ভেবে চিন্তে  তার বিশাল মন্ত্রিসভা থেকে  ষাটজন বিজ্ঞ মন্ত্রীকে বেছে নিলেন, যারা সব কাজ বাদ দিয়ে বইগুলি পড়বে এবং এর একটা সার সংক্ষেপ তৈরী করবে। যেই ভাবা সেই কাজ, তিনি সমস্ত পুস্তকগুলো ষাট ভাগে ভাগ করে ওই মন্ত্রীদের বললেন, সেগুলো পড়ে একটা সার সংক্ষেপ বা সারমর্ম লিখে আনতে। মন্ত্রীদের এই কাজের জন্য প্রচুর অর্থও বরাদ্দ করে দিলেন। আরো বললেন এই পুস্তকগুলোর সারমর্ম লিখে আনলে তিনি প্রত্যেককে একটি করে রাজ্য লিখে দিবেন।
ষাটজন মন্ত্রী তো মহাখুশী। বই পড়ে সারমর্ম লিখে আনলেই রাজ্য পাবেন, রাজা হয়ে যাবেন। নিজ নিজ ভাগের পুস্তক নিয়ে তারা চলে গেলেন। সম্রাট তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন এই ষাট জন মন্ত্রীর খোঁজ খবর রাখতে। তাদের যেন কোন দিক দিয়েই কোন অসুবিধা না হয়। এতগুলো বই তো আর একদিনে পড়া সম্ভব নয়। তবুও রাজ্য পেয়ে রাজা হবার মোহে তারা খুব দ্রুত পুস্তক পড়ে সার সংক্ষেপ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। বহু দিন পর তারা এলেন সম্রাটের  কাছে। সম্রাট জানতে চাইলেন সারমর্ম তৈরী হয়েছে কি না? তারা জানালো হয়েছে। সম্রাট সারমর্ম দেখতে চাইলেন। তারা জানালো বাইরে বেশ কয়েকটা ঠেলা গাড়ীতে রয়েছে সব বই’এর সারমর্ম ।
সম্রাট বিস্ময়ে জানতে চাইলেন ঠেলা গাড়ীতে সারমর্ম ? উত্তরে তারা সকলে এক বাক্যে বললো এত এত জ্ঞানের পুস্তক, যা একত্রে করলে ছোট খাটো পাহাড়ের সমান হয়, তার সারসংক্ষেপ তো সেরকমই হবে! ঠেলা গাড়ী ছাড়া সেটা নিয়ে আসা তো সম্ভব নয়। শুনে সম্রাট বিরক্ত হলেন। সারমর্ম এত বড় হবে কেনো? তিনি ষাট মন্ত্রীকে ফেরত পাঠালেন,বলে দিলেন আবার পড়ে সংক্ষেপে লিখে আনতে। তারা ফিরে গেলো। দিন যায় মাস যায়,বছরও চলে যায়। অনেক বছর খানেক পর তারা আবারো ফিরে এলো সম্রাাটের দরবারে নতুন এক সারসংক্ষেপ নিয়ে। এবার তারা পৃথিবীর সমস্ত পুস্তকের জ্ঞান, তাদের মতে একবারেই সংক্ষিপ্ত করে এনেছে। সম্রাট দেখলেন তাদের হাতেই মোটাসোটা ডিকশনারী জাতীয় পুস’ক। সম্রাট জানতে চাইলেন এটা কি। তারা জানালো পৃথিবীর সমস্ত পুস্তকের সার সংক্ষেপ যা আমরা পড়েছি। সম্রাট আবারো অসুন্তোষ্ট হলেন। সারমর্ম এতবড় হবে কেনো? সারমর্ম হবে দু’তিন লাইনের।
সম্রাট আবারো ফেরত পাঠালেন, ভাল করে পড়ে, বুঝে, সারমর্ম তৈরী করতে । দিন পার হলো, মাস গড়িয়ে যাচ্ছে একটা একটা করে, এমনকি বছরও। ষাট মন্ত্রীর আর দেখা নেই। এক সময় ব্যাকুল হয়ে সম্রাট লোক পাঠালেন তাদের খোঁজ খবর নিতে।
লোকজন তাদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলো ষাটমন্ত্রীর আচার আচরণ সম্পূর্ন বদলে গেছে। অনেক দিন হল চুল দাড়ি কাটেনা কেউ। তাদের এমন অবস’ার কথা শুনে সম্রাট বলে দিলেন ওদের কাজে যেন কোন বিঘ্ম না ঘটে, যখন যা প্রয়োজন সেটার সরবরাহ যেন অব্যাহত থাকে। তাদের পবিরারের দিকে যেন খেয়াল রাখা হয়।  লোকেরা জানালো তাদের কোন চাহিদাও নেই।
বহু বছর পর তারা হাজির হলো সম্রাটের দরবারে। এসে এক টুকরো কাগজ বাড়িয়ে দিল সম্রাটের দিকে। ওই কাগজের টুকরোয় লেখা আছে পৃথিবীর সকল বই-এর সারমর্ম। সম্রাট বেজায় খুশি হলেন। ওদের একেক জনকে একেকটি রাজ্যও লিখে দিতে দলিল আনতে বললেন। সম্রাটকে অবাক করে দিয়ে ওরা জানালো এখন তারা রাজ্য চায় না। কিছুই চায় না। এমন কি মন্ত্রীর পদমর্যাদা ছেড়ে ওরা চলে যাবে। তারা শুধু সারমর্মটা সম্রাটের হাতে দিতেই এসেছে। কাগজের টুকরোটি হাতে নিয়ে সম্রাট পড়লেন। তাতে লেখা আছে, ‘‘নিজেকে জানো’’। নিজেকে জানলেই সব জানা হয়ে যাবে।

চলবে………….

লেখক:
সৈয়দ হারুন,
প্রশিক্ষক, সিলভা আল্ট্রামাইন্ড ইএসপি সিস্টেম

 

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com