মঙ্গলবার  ১৫ই জুন, ২০২১ ইং  |  ১লা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ৪ঠা জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী

মুনিয়ার মৃত্যুকে পুঁজি করে সরকার পতনের ডাক!

তারা দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে। ব্যানারে নাগরিক সমাবেশের কথা বলা হলেও মূলত এটি ছিল ভাসানী অনুসারী পরিষদের আয়োজন। জাতীয় পর্যায়ের কয়েকটি সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতির ঘোষণা দিয়ে হাজির করা হয় চিহ্নিত বিএনপি নেতাসহ বিতর্কিত ব্যক্তিদের। ওই তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকে পুঁজি করে তারা স্পর্শকাতর এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে সরকারের বিষোদগার করেন। ক্ষোভ ঝাড়েন সরকার ও পুলিশের বিরুদ্ধে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আজ শনিবার সকালে এ সমাবেশ আয়োজন করা হয়।

kalerkantho

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ভোট ডাকাতি করে এই ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় বসেছে। ব্যালট ডাকাতি করে পুলিশ এই সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এই ভোট ডাকাতির কারণে পুলিশ ও সরকারের বিচার করব আমরা। এই স্বৈরাচার সরকার, লুটপাটের সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না। তারা ভারতের তাঁবেদারি করে, দেশের মানুষের কথা ভাবে না। এই জালিম সরকারকে রাস্তায় টেনে নামাতে হবে।

সরকারের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্যে তারা আরো বলেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে দেশের মানুষ আপনাদের এমনভাবে ঘেরাও করবে, পালাবার পথ পাবেন না। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণের বিষোদগার করে তারা বলেন, ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য আমার দেশের ভাইদের রক্তাক্ত করা হয়েছে।

আয়োজক সংগঠন ভাসানী অনুসারী পরিষদের বিষয়ে জানা যায়, সংগঠনটি বিভিন্ন সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের বিরোধিতা করে আসছে। সর্বশেষ দেশের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণের প্রতিবাদে হেফাজতের আন্দোলনকেও সমর্থন দেয় তারা। এমনকি ওই ইস্যুতে সরকারবিরোধী সমাবেশ এবং বিক্ষোভও করেছে সংগঠনটি।

আজকের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির অঙ্গসংগঠন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি ও সূত্রাপুর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফরিদ উদ্দিন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব নঈম জাহাঙ্গীর, ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবুল, নাগরিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোশারফ হোসেনসহ বেশির ভাগ বিএনপির নেতা।

এই বক্তাদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হেফাজত ইস্যুতে তাদের অনেককে মাঠ গরম করতে দেখা গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের লঙ্কাকাণ্ডের ঘটনায় অপরাজনীতিতে নামেন তাঁরা। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উসকানি দিয়ে মাঠে নামানোর চেষ্টা করেন। বিএনপির নেতারা সম্প্রতি যেকেনো ইস্যুকে সরকারের ওপর চাপিয়ে মাঠ গরম করতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজধানীর গুলশানে মোসারত জাহান মুনিয়া নামের এই তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাকেও পুঁজি করে সরকারবিরোধী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন। মামলার তদন্ত দাবি করতে এসে বললেন, সরকার পালাবার পথ খুঁজে পাবে না।

জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের বিষয়ে জানা যায়, তার নেতৃত্বে ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই দিন হাইকোর্টের সামনে কোনো রকম উসকানি ছাড়াই পুলিশের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায় বিএনপি ক্যাডাররা। তারা পুলিশের গাড়িসহ বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ওই ঘটনার পর বিদেশ পালানোর সময় এয়ারপোর্ট থেকে আটক হন উলফাত। রিমান্ড এবং হাজতবাসের পর জামিনে এসে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি।

এদিকে, হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থে এমন আয়োজন নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করেন রিপন নামের এক বিএনপি নেতা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করি। আমাদের কি সময় আছে এসব প্রোগ্রাম করার? আমাকে রাতে কল দিয়েছে তাই আসছি। তাছাড়া যে মেয়েটি মারা গেছে তাকে নিয়ে এসব করা ঠিক না, কি দরকার এসব প্রোগ্রাম করার। আমার মনে হয় আজকে যা করছে তা ঠিক করেনি।

নাগরিক সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টকর্মী খেটেখাওয়া মানুষ। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ‘একটি মিটিংয়ে’ অংশগ্রহণের কথা বলে তাদের প্রেস ক্লাবের সামনে থাকতে বলা হয়। ত্রাণ এবং অনুদান দেওয়ার কথা বলে তাদের এখানে আনা হয়। কিন্তু তারা জানেনই না কোথায় কোন ধরনের মিটিংয়ে অংশ নিতে যাচ্ছেন। সমাবেশ চলাকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তারা ঠিকমতো কথাই বলতে পারছিলেন না।

সমাবেশে বক্তব্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি ও সূত্রাপুর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘এই সরকার জালিম সরকার, এই সরকার স্বৈরাচার সরকার। টেনেহিঁচড়ে এই সরকারের পতন ঘটাতে হবে। পুলিশ দিয়ে মানুষ গুম করে, খুন করে। কিন্তু বিচার নাই। এই সরকার ভারতের তাঁবেদারি করে, নিজেদের দেশ চালানোর ক্ষমতা নেই’।

নাগরিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীকে এনে চরম ভুল করেছেন। আপনারা দেখেছেন ইসলামের কথা বললে সরকারের সহ্য হয় না। ইসলামের কথা বললেই দমন করা হচ্ছে। ভারত আমাদের শাসন করছে। ভারতের কারণে আমার ইসলামী ভাইদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানের সময় মেরে ফেলা হয়েছে। ধিক্কার জানাই এ দেশের শাসন ব্যবস্থাকে। একজন ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য আমার দেশের ভাইদের রক্তাক্ত করা হয়েছে। কারণ আপনি রাজার নীতি দিয়ে দেশ চালান। রাজনীতি শিখেন নাই।

ডা. মামুন হাসিব ভুঁইয়া বলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের পরও বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলতে হয়। এদেশে গণতন্ত্র নেই। এই সরকার ভোটে আসে নাই। বর্তমান সরকার অবৈধ সরকার। নির্বাচনে কারচুপি করে করে এ সরকার ক্ষমতায় আছে। আমরা এ সরকার মানি না। অবিলম্বে এ অবৈধ সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সঠিক দায়িত্ব পালন করে না দাবি করে তিনি বলেন, পুলিশ সরকারের তাঁবেদারি করে।

গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে নিজের ভাড়াবাসা থেকে মোসারত জাহান মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই রাতেই গুলশান থানায় আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা করেন মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ। জানা গেছে, পুলিশের তদন্তের একপর্যায়ে মুনিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুতে উঠে আসে চট্টগ্রামের পটিয়ার সাংসদ হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের নাম। পুলিশ ঘটনার শুরু থেকেই সবদিক আমলে নিয়ে মামলাটির তদন্ত করছে।

জানা গেছে, প্রথম দিকে পুলিশের ভূমিকায় সন্তুষ্ট থাকতে দেখা গেছে মামলার বাদী নুসরাতকে। কিন্তু মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের একপর্যায়ে হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর নাম উঠে আসলে বেঁকে যান নুসরাত। তিনি এবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় এবং সংবাদ সম্মেলনেও পুলিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। গোটা বিষয়ে পুলিশের তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে, মুনিয়া ‘হত্যাকাণ্ডের শিকার’ দাবি করে শারুনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। মামলার আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মুনিয়া আত্মহত্যা করার মতো মেয়ে নয়। তাকে শারুনের নেতৃত্বে খুন করে কৌশলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে। তিনি এ ঘটনার শারুনের বিচার চেয়ে আসছেন।

অন্যদিকে, মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে উসকানি ও অর্থায়নেরও অভিযোগ রয়েছে হুইপপুত্র শারুনের বিরুদ্ধে। গত ২৬ মে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে টাকার ভাগবাটোয়ারা হতে দেখা যায়। আয়োজক সংগঠনও নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে একপর্যায়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সর্বশেষ শারুনের অর্থায়নে নাগরিক সমাবেশ ডাকল ভাসানী অনুসারী পরিষদ।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com