বুধবার  ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং  |  ১৩ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪৩ হিজরী

ভারতে গিয়ে গায়ক বাদাম বিক্রেতাকে খুঁজে বের করলেন বাংলাদেশি তরুণ

বাংলাদেশের তরুণ মাহসান বুকের সমস্যা নিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন চিকিৎসা নিতে। গিয়েছেন স্ত্রীসহ। সেখানেই খেয়াল করলেন দেশীয় সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক বাদাম বিক্রেতাকে নিয়ে হৈচৈ। খুব ভালো করে দেখলেন তরুণ-তরুণীরা ব্যাপকভাবে টিকটকে মেতেছেন এই বাদাম বিক্রেতাকে নিয়ে।

ওহ, তাঁর আগে বলে নিই, বাদাম বিক্রেতা ভুবন বাদ্যকরকে চেনেন? শুনেছেন তাঁর গান? যদি এর উত্তর না হয়, তাহলে আপনি অনলাইনে সক্রিয় দাবি করে থাকলে সেটি ভুল করবেন। এই মুহূর্তে ভুবন বাদ্যকর একটা ট্রেন্ড। গোটা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীর কাছে খুব পরিচিত নাম। এই মুহূর্তে সব সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ভুবন বাদ্যকরকে নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে।

আসল গান এটাই

যাহোক, মাহসান একজন ইউটিউবার। দেশের পরিচিত ইউটিউবারদের মধ্যে একজন। ভাইরাল বিষয় দেখলেই ছুটে যান। তাঁর মাথায় ভূত চাপল- ভুবন বাদ্যকরের সঙ্গে দেখা করবেন। তাঁর আগে বলে নেওয়া খুবই প্রয়োজন- ভুবন বাদ্যকর ইন্টারনেটে কেন আলোচনার শীর্ষে, তাই না?

ভুবন বাদাম বিক্রি করেন, ভাজা বাদাম নয়, কাঁচা বাদাম। ভাজা বাদামের অপকারিতা আর কাঁচা বাদামের উপকারিতা নিয়ে একটি গান বেঁধেছেন তিনি। এই গানের কথা যুক্ত হয়েছে টাকা ছাড়াও কিসের বিনিময়ে বাদাম বিক্রি করেন, যেমন ভাঙা মোবাইল, সিটি গোল্ডের পুরনো জিনিস, মাথার চুল ইত্যাদি। গানের কথায় এসব আর অদ্ভুত সুর তরুণরা ইন্টারনেটে পাওয়া মাত্রই লুফে নেয়।

বাংলাদেশের ইন্টারনেটে হুট করেই জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া ভুবন বাদ্যকরকে নিয়ে তেমন আগ্রহ না থাকলেও তার গান নিয়ে টিকটক লাইকিতে তুমুল ঝড় ওঠে। অনেক সংগীতশিল্পী গানটিকে লুফে নিয়ে নতুন সংগীত আয়োজনে গাইতে শুরু করেন। র‍্যাপ যুক্ত গান তৈরি হয়ে যায় অসংখ্য।

মাহসান যাবেন ভুবন বাদ্যকরের সঙ্গে দেখা করতে। কলকাতার পথ জেনে নিলেন, মোটামুটি যতটা জানা যায়, হাওড়া থেকে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে চেপে বসলেন। ৬ ঘণ্টা পর যে স্টেশনে নামলেন সেটা ভুল স্টেশন। রামপুরহাট স্টেশনে কথা বলে জানলেন, বীরভূমের যেখানে যেতে চান মাহসান, সেটা আরো চার স্টেশন পূর্বে। তার মানে ফেরত যেতে হবে। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এদিন আর যাওয়া যাবে না। হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন মাহসান।

কলকাতা থেকে গত রাতে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেন মাহসান স্বপ্ন। বললেন, ‘ভাই আমি যে কী বিপদে পড়ছিলাম! চার স্টেশন সামনে চলে গেছি। এমন একটা এলাকা, সেখানে থাকার জায়গাও নাই। পরে সেখান থেকে  আমরা তারাপীঠ চলে আসি। সেখানে ভোর চারটা পর্যন্ত ছিলাম। ৫টার সময় একটা ট্রেনে উঠে আমরা দুবরাজপুরে নামি। দুবরাজপুর ব্লকের লক্ষ্মীনারায়ণপুর পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত গ্রাম কুড়ালজুড়ি গ্রামে আসি নানা পথ ভেঙে। এটা এমন একটা দুর্গম এলাকা, সঙ্গেই ঝাড়খণ্ড রাজ্য।’

সকালে অটো থেকে নামতেই দেখা হয় ভুবন বাদ্যকরের সঙ্গে। প্রথমে জড়িয়ে ধরেন মাহসান। তারপর ভুবন বাদ্যকরের সঙ্গে কথা বলেন। খুব মনোযোগ দিয়ে গান শোনেন। ততক্ষণে ভিড় জমে যায় ওই এলাকায়। এরপর ভুবন যেখানে থাকেন, সেখানে নিয়ে যান মাহসানকে। এক জীর্ণ পলিথিনে ছাওয়া মাটির ঘরে থাকেন ভুবন। পরিবারে রয়েছে স্ত্রী, দুই ছেলে। এক ছেলের বউ ও নিজের স্বামী পরিত্যক্ত বোন।

মাহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটা অসহায় দরিদ্র লোক ভুবন বাদ্যকর। তিনি এখন ভাইরাল। ইন্টারনেটে তার গান নিয়ে মানুষজন বিনোদন পাচ্ছে। অথচ তার অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। আমি একটা ভিডিও করেছি, সেখানে তিনি নিজের ফোন নম্বর বলে দিয়েছেন। সেই ফোন নম্বরে মানুষজন যোগাযোগ করতে পারবে।’

ভুবনের গান রিমিক্স

কেন ভাইরাল- এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল মাহসানের কাছে। কালের কণ্ঠকে বললেন, আসলে তার গানের কথা স্বাভাবিক না। ইন্টারনেটে মানুষজন অস্বাভাবিক বিষয়গুলোকেই খুঁজে বেড়ায়, হয়তো এতে বিনোদন পায়। আর গানের সুরে এক অদ্ভুত বিষয় রয়েছে, যা একবার কানে গেলে মনে হয় আরেকবার শুনি। এসব কারণেই তার গাওয়া গান ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভুবন বাদ্যকর ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় তাঁর বাসায় ছুটে যান বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা। বাদামওয়ালা ভুবনের এই গানের সুরের টানে ছুটে আসেন অনেকে। শুধু গান শোনা নয়, গানের পাশাপাশি তাঁর কাছে ক্রেতারা বাদামও কেনেন। শুধু টাকা দিয়ে নয়, পুরনো সিটি গোল্ডের চেন, চুড়ি, হাতের বালা, মোবাইল ভাঙা, হাঁসের পালক, মাথার চুল ইত্যাদির বিনিময়েও বাদাম কেনা যায় তাঁর কাছ থেকে। দৈনিক আয় ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এখন কিছুটা বেড়েছে।

মাহসান সেদিনই কলকাতায় ফিরে এসেছেন। এখনো সেখানেই রয়েছেন। ফোনে কালের কণ্ঠকে জানালেন, তিনি চিকিৎসার জন্য আরো কয়েক দিন থাকবেন। সুযোগ পেলে ভুবনের হালনাগাদ তথ্য নিয়ে ফিরবেন।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com