বুধবার  ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ১৮ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

ব্যাটিংয়ে বিদেশি বোলিংয়ে দেশিদের দাপট

ক্রীড়া প্রতিবেদক : নিজ দলের ১১ ম্যাচের ১০টিতেই মাঠে নেমেছেন তিনি। কিন্তু সিলেট সিক্সার্সের বিপক্ষে আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে সেই যে ৪ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন, এরপর আর অত ওপরে নামার সুযোগই হয়নি মোসাদ্দেক হোসেনের!

পরের ৯ ম্যাচের মধ্যে একটিতেই কেবল সর্বোচ্চ ৫ নম্বরে খেলার সুযোগ হয়েছিল ঢাকা ডায়নামাইটসের এ ব্যাটসম্যানের।

কিন্তু ৬ বলে মাত্র ২ রান করে আউট হয়ে যাওয়াতে দলও আর তাঁকে ওপরে উঠিয়ে আনার কথা ভাবেনি। তাই বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে ব্যাটিংয়ে দেখা গেছে ৭ কিংবা ৮ নম্বরে। মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের জায়গা নড়ে গিয়ে লোয়ার অর্ডারে চলে যাওয়ায় এবারের বিপিএলে বিশেষ কিছু করতেও পারেননি এই তরুণ।
অথচ গত আসরেই ঢাকা ডায়নামাইটসের শিরোপা জয়ে ব্যাট হাতে দারুণ অবদান ছিল মোসাদ্দেকের। ১৪ ম্যাচে সর্বোচ্চ অপরাজিত ৫৯ রানের ইনিংসসহ ৩৩.৭৭ গড়ে করেছিলেন ৩০৫ রান। গতবারের অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান কিনা এবার সব মিলিয়ে করতে পেরেছেন মোটে ৫০ রান! শিরোপা ধরে রাখার চিন্তায় তাঁর ঢাকার ব্যাটিং একটু বেশিই বিদেশি-নির্ভর হয়ে পড়ায় মোসাদ্দেকের মতো ব্যাটসম্যানদের নিজেকে মেলে ধরার পথও বন্ধ হয়ে গেছে অনেকটাই।

নিজেদের এমন পরিণতি যে দেখতে হতে পারে, সে মানসিক প্রস্তুতি অবশ্য মোসাদ্দেকের মতো আরো অনেক ব্যাটসম্যানের আগে থেকেই ছিল। বিশেষ করে এক ম্যাচে পাঁচ বিদেশি খেলানোর নিয়ম হতেই বোঝা গিয়েছিল যে সাফল্য-চিন্তায় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ভিনদেশিদের ওপরই আস্থা রাখবে বেশি। মোসাদ্দেকের দল ঢাকা ডায়নামাইটসও এর ব্যতিক্রম নয়।

টি-টোয়েন্টির চাহিদা অনুযায়ী মারদাঙ্গা ব্যাটিং জানা বহু বিদেশি ব্যাটসম্যানে দল ভারী করা বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা এর সুফলও পেয়েছে।
আর যেদিন পায়নি, সেদিন নিচের দিকে ঠাঁই পাওয়া স্থানীয় ব্যাটসম্যানরাও পারেননি বিদেশিদের ব্যর্থতা পুষিয়ে দেওয়া পারফরম্যান্সে জয় এনে দিতে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে এ রকম ঘটনাই বেশি হওয়ার দায় তাই নিজেদের কাঁধে নিতেও দ্বিধা করলেন না মোসাদ্দেক। ব্যাটিংয়ে নিজ দলের বিদেশি-নির্ভরতাকে অযৌক্তিকও মনে করেন না এ জন্যই, ‘আমরা যে ম্যাচগুলো জিতেছি, তার বেশির ভাগেই বিদেশিরা খেলে দিয়েছে। তাই দলও ওদের ওপরই বেশি বিশ্বাস রাখছে। ওরা খেলে দিলে আমাদের রান হচ্ছে অনেক বেশি। ওরা যেদিন পারছে না, সেদিন আমাদের নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে ভালো ব্যাকআপও পাচ্ছি না। কয়েকটি ম্যাচে তাই আমাদের হারতেও হয়েছে। ’

অবশ্য স্থানীয় ব্যাটসম্যানদের সংকটের সময়ে বোলারদের পারফরম্যান্স দেখে ঠিকই স্বস্তি খুঁজে নিতে পারছেন মোসাদ্দেক, ‘দেশি যারা আছে, তারা ব্যাটিংয়ে সুযোগ না পেলেও বোলিংয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করছে। শেষ ম্যাচে দেশি বোলাররাই বেশি উইকেট নিয়ে দিয়েছে। এদিক থেকে তো সব কিছুই ঠিকঠাক আছে। ’ বোলিংয়ের দিক থেকে এই আসরে মোসাদ্দেকের ভাষায় সব কিছু ঠিকঠাক রেখেছেন যাঁরা, তাঁদের পুরোভাগে আছেন খোদ ঢাকা ডায়নামাইটসের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।

বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়া ম্যাচটি বাদ দিয়ে খেলা ১০ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে এই অলরাউন্ডারই এখন চলতি বিপিএলের শীর্ষ বোলার। ব্যাটিংয়ে এখনো দলের চাহিদা সেভাবে মেটাতে না পারলেও বোলিং দিয়ে ঠিকই দলকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, বিদেশিদের ভিড়ে স্থানীয় বোলাররাই হয়ে উঠেছেন নিজ নিজ দলের আস্থার প্রতীক। বোলিংয়ের সেরা পাঁচে সাকিবের পরের চারটি স্থানও দেশি ক্রিকেটারদেরই। এই সিদ্ধান্তে তাই পৌঁছাই যায় যে ব্যাটিংয়ে না পারলেও বোলিংয়ে বিদেশিদের ছাপিয়ে যেতে পেরেছেন বাংলাদেশের বোলাররা।

ব্যাটিংয়ের সেরা পাঁচে রংপুর রাইডার্সের মোহাম্মদ মিঠুন (১১ ম্যাচে ২৯৭ রান করে তৃতীয় স্থানে) একমাত্র দেশি ক্রিকেটার হলেও বোলিংয়ে শুধুই স্থানীয়দের জয়জয়কার। ১০ ম্যাচে ১৬ উইকেট নিয়ে সাকিবের ঠিক পরেই আছেন খুলনা টাইটানসের ডানহাতি পেসার আবু জায়েদ। এই তরুণের মতো দারুণ উৎসাহব্যঞ্জক মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের বোলিংও। পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের এ পেসার ১০ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়ে আছেন তিন নম্বরে। এবার ব্যাট হাতেও একাধিক ম্যাচ জেতানো মাশরাফি বিন মর্তুজা ১১ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে বোলাদের মধ্যে চার নম্বরে আছেন। সেরা পাঁচ বোলারের মধ্যে রংপুর রাইডার্স অধিনায়কের ইকোনমি রেটও সবচেয়ে কম (৬.৫৮)।

ইতিমধ্যেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়া চিটাগং ভাইকিংসের ফাস্ট বোলার তাসকিন আহমেদও ১৩ উইকেট নিয়ে বোলারদের সেরা পাঁচে আছেন এখন পর্যন্ত। বেশ কয়েকটি ম্যাচে ডেথ ওভারে গিয়ে গড়বড় করে দলের হারের কারণ হয়েছেন তাসকিন। তবে ওই সময়টা বাদ দিলে তাঁর বোলিংয়ের প্রশংসায় নিয়মিতই পঞ্চমুখ হতে শোনা গেছে ভাইকিংদের অধিনায়ক লুক রংকিকে। সাফল্য দিয়ে দলের মধ্যমণি হওয়ার লড়াইয়ে দেশি ব্যাটসম্যানরা পিছিয়ে পড়লেও বোলাররা ঠিকই নিজেদের এগিয়ে রেখেছেন।

এগিয়ে রেখেছেন বলেই বিপিএলও এবার বিদেশিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের গল্প হয়ে উঠতে পারেনি!

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com