শিরোনাম
শনিবার  ১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ ইং  |  ৩রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  |  ২রা জমাদিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

বিএনপির রাজনীতিতে মৃদু দোলা

বিএনপির দুই নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ ও শওকত মাহমুদের শোকজের বিষয়টি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা না হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। কী কারণে ওই শোকজ দেওয়া হয়েছে সে নিয়েও অন্ধকারে আছেন তাঁরা। পাশাপাশি শোকজে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও তাঁদের আপত্তি আছে। তবে শোকজের জবাব মেজর হাফিজ এবং শওকত মাহমুদ যেভাবে দিয়েছেন তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট। ফলে এরপরে আর কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা তাঁদের বিরুদ্ধে নাও নেওয়া হতে পারে।

এদিকে পেশাজীবী সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা শওকত মাহমুদ একসময় তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হলেও গত নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ায় কিছুটা ক্ষুব্ধ বলে জানা যায়। তবে তিনিও শোকজের জবাবে নমনীয় মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। সব কিছু মিলে তাঁদের দুজনকে বহিষ্কারের আশঙ্কা কম।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্তত সাতজন নেতার সঙ্গে গতকাল কথা বলে তাঁদের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে তাঁরা বলেছেন, শোকজের বিষয়টি স্থায়ী কমিটিকে অবহিত করা হয়নি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এ প্রসঙ্গে কথা বলেননি। উপস্থিত অন্য নেতারাও বিষয়টি তোলেননি।

এদিকে তারেকের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, মূলত এক-এগারো-পরবর্তী ঘটনার কারণেই তাঁর নির্দেশনায় দলের এই দুই নেতাকে শোকজ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের নামে লোক সমাগম ঘটিয়ে তারেকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগটিও গুরুত্ব পেয়েছে। ওই দিন সকালে ব্যাপক লোক সমাগম করে সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা ছিল বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে। দলের নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর তত্ত্বাবধানে সংগঠিত ওই কর্মসূচির কথা বিএনপির নীতিনির্ধারকের অনেকের জানা না থাকায় তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দলীয় মূল্যায়নে পরবর্তীতে ওই কর্মসূচি ‘হঠকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই ঘটনার এক বছর পর ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী।

এক-এগারোর পর সংস্কার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে বিভক্তি তৈরি হয়, যার রেশ এখনো দলটির মধ্যে রয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। ফলে দলের মূল স্রোতের বাইরে সংগঠিত যেকোনো ঘটনা ও তৎপরতাকে বিএনপি ভয় পায়।

গত ১৪ ডিসেম্বর পুরানা পল্টন ও গুলিস্তানে হঠাৎ করে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী অবস্থান ও সমাবেশ করেন। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দলের এ দুই নেতাকে শোকজ করা হয়। তবে তাঁদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বিএনপির হাইকমান্ড এখনো নেয়নি। কারণ দলের ভেতরে ও বাইরে ওই দুই নেতার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে করা হয়। তা ছাড়া শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে ওই দুই নেতার শোডাউন ছিল মূলত সরকারের বিরুদ্ধে। সেখানে বিএনপির বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহে’র কোনো বিষয় ছিল না। শরিক ২০ দলীয় জোটের নেতাদেরও কেউ কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার বাইরে ওই তৎপরতাকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ভালোভাবে নেয়নি। তাঁরা ওই ঘটনাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান মনে করেন, অস্বাভাবিক কোনো ঘটনার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ওই তৎপরতা হলে সেটির নিয়ন্ত্রণ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতছাড়া হতে পারে। সরকারবিরোধী যেকোনো কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ বিএনপি তথা তারেক রহমান হাতে রাখতে চাইছেন। অস্বাভাবিক ঘটনার দায় ও লোক সমাগম এড়াতে একই দিনে বায়তুল মোকাররমে হেফাজত নেতা নূর হোসাইন কাসেমীর জানাজায় অংশগ্রহণ থেকেও বিরত থাকে বিএনপি।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, ‘দুই নেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দলের হাইকমান্ডের বিষয়। তবে বিএনপি একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বিএনপির ক্ষমতায় আসতে হবে। অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসা বিএনপি সমর্থন করে না।’

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার কালের কণ্ঠকে জানান, ‘দলের দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হবে না। তাঁদের কেবল সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর ঘটনা আমাদের এখনো বিচলিত করে। কারণ অস্বাভাবিক ওই ঘটনার কারণে আজ পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। সমাবেশ বা তৎপরতা যেটাই হোক দলের হাইকমান্ডকে জানিয়ে ওই দুই নেতার করা উচিত ছিল।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আলোচ্যসূচি না থাকার কারণেই দুই নেতার বহিষ্কারের বিষয়টি স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হয়নি।’ তবে নাম না প্রকাশের শর্তে স্থায়ী কমিটির আরেক নেতা বলেন, ‘শোকজের বিষয়টি আলোচনায় আনলে বিতর্ক বেশি হতো। তা ছাড়া জবাবের বিষয়টি এখন পাবলিকলি ওপেন হয়ে গেছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্তত সাতজন নেতার সঙ্গে গতকাল কালের কণ্ঠের কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা প্রত্যেকেই জানান, হাফিজের জবাব অত্যন্ত সুলিখিত এবং তিনি কাউকে আঘাত করে কোনো কথা বলেননি। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে হাফিজের অবদান, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, সর্বোপরি নিজের পারিবারিক ঐতিহ্যের কথাও তিনি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এমনকি এক-এগারোর পরে তাঁর ভূমিকা ও ঘটনাবলির কথাও বিএনপির প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জের সুরে উল্লেখ করেছেন হাফিজ। ফলে সংস্কারপন্থী হিসেবে হাফিজের বিরুদ্ধে অপপ্রচারও ওই জবাবে বন্ধ হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

‘এক-এগারো’ ঘটনার পর ওই বছরের (২০০৭) ২৫ জুন রাজনৈতিক সংস্কারের নামে দলটির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেন; যাতে কার্যত দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মাইনাস করা হয়। ওই সময় বিএনপির শতাধিক এমপি মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে থাকলেও পরবর্তীকালে তাঁদের অধিকাংশই বিএনপিতে ফিরে আসেন। হাফিজ সেই সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতদের একজন।

অনেকের মতে, যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া এবং নানা কারণে ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত থাকায় বর্তমান সময়েও বিএনপিতে কিছুটা অনৈক্য রয়েছে। বিশেষ করে সিনিয়র অনেক নেতার সঙ্গে দূরত্ব রয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। এ কারণে নিজের সিদ্ধান্তের বাইরে যেকোনো তৎপরতাতে তিনি এক-এগারোর ছায়া দেখেন। এক-এগারো সরকারের চাপে মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বাধীন সংস্কারপন্থী অংশের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করা হয়েছিল হাফিজকে। ফলে বিএনপির একটি অংশ সেই থেকে তাঁর বিরোধিতা করছেন। যদিও মহাসচিব ঘোষণা করার বিষয়টি জানা ছিল না বলে শোকজের জবাবে দাবি করেছেন হাফিজ।

অবশ্য ফিফা কর্তৃক বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সেরা ফুটবলারের সম্মানে ভূষিত হওয়া মেজর হাফিজ উদ্দিন আহম্মদের বিএনপির ওপরে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে বলে জানা যায়। গত ২৯ বছর ধরে দলটির রাজনীতি করেও ২২ বছর ধরে তিনি একই পদে আছেন। এর মধ্যে চারবার তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছেন। রাজনীতিতে তাঁর অনেক জুনিয়রকে স্থায়ী কমিটিতে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি বঞ্চিত হয়েছেন।

জানতে চাইলে হাফিজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে জানান, ‘দল থেকে পদত্যাগ করার কোনো সিদ্ধান্ত আমি নিইনি। আমি এখনো বিএনপিতেই আছি।’ আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব মেনেই আমি বিএনপিতে আছি। দলের বিরুদ্ধে আমি যাব না।’

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com