সোমবার  ২রা আগস্ট, ২০২১ ইং  |  ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জিলহজ্জ, ১৪৪২ হিজরী

প্রবাস আয়ে ‘ম্যাজিক’

বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র ১০ বছর ধরে এমন গতিতেই চলছে; ধারণাই করা যাচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতির মোড়লরা এখন বাংলাদেশকে তাই ‘ম্যাজিক অর্থনীতির’ দেশ বলছে। এই কারণে করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যে রেমিট্যান্স আয়ে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে চলেছে বাংলাদেশ। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।

৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশের এখনো দক্ষ-প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠানোয় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি; কিন্তু অনভিজ্ঞ, কম দক্ষ ও অল্প শিক্ষিত কর্মীরাই এভাবে নিজ দেশে অবদান রাখবেন—তা এক দশক আগেও কেউ কল্পনা করতে পারেনি। আমাদের সেই অনভিজ্ঞ প্রবাসকর্মীরা কয়েক বছর আগে থেকেই দেশের রিজার্ভের আকার বাড়াতে ভূমিকা রাখছিলেন। প্রবাসযোদ্ধাদের পাঠানো টাকা বা রেমিট্যান্স একটু একটু করে দেশের সবার নজর কাড়ছিল। কিন্তু কভিড মহামারির মধ্যে এসে সেটি ইতিহাস গড়ল। বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রেকর্ড পরিমাণ বেশি।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাবে, এখন এক কোটি ৩০ লাখ কর্মী বিদেশে কর্মরত আছেন; বেসরকারি হিসাবে অবশ্য এই সংখ্যা আরো বেশি। সে যা-ই হোক, সেই কোটি প্রবাসযোদ্ধাই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন। আগে তাঁদের অবদান অত বেশি ফোকাস না হলেও কভিড-১৯ মহামারির সময় তা মনে করিয়ে দিয়েছে ‘আমরাও বাংলাদেশের প্রাণশক্তি’।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাবে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে এক কোটি ২৯ লাখ কর্মী বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছেন, অর্থাৎ সরকারি নিবন্ধন নিয়ে তাঁরা বিদেশে চাকরি করতে গেছেন। এই কর্মীদের ৮০ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে; বাকি ১৫ শতাংশ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে।

কর্মী রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকা খুবই সামান্য। আত্মীয়তার সূত্র ধরে বেশির ভাগ কর্মী বিদেশে চাকরি নিয়ে যাচ্ছেন। আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভালো অবস্থানে আছেন; ভালো রোজগার করছেন। ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে তাঁরাই নিজ এলাকার আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে যাচ্ছেন।

কভিড-১৯ মহামারিতে চলতি বছরে বাংলাদেশে প্রবাস আয় (রেমিট্যান্স) গত বছরের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ কমবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। তখন বিশ্বব্যাংক বলেছিল, করোনার কারণে এ বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স ২২ শতাংশ কমে ১৪ বিলিয়ন ডলারে নামতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির ধস থেকেই তারা এই ধারণা দিয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই পূর্বাভাস ধোপে টেকেনি।

বাংলাদেশে কভিডের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এপ্রিলে; সেই মাসে প্রবাস আয় কমে হয়েছিল ১০৯ কোটি মার্কিন ডলার। অথচ জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড রেমিট্যান্স এসেছে; যার পরিমাণ ২৫৯ কোটি মার্কিন ডলার। জুলাই মাসের এই রেমিট্যান্স দেখে সেই পূর্বাভাসধারীরা তো হতবাক। তখন দেশে অভিবাসী নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলো বলেছিল, এই ধারা বেশি দিন থাকবে না। আগস্টে রেমিট্যান্সের ধারা কিছুটা কমলেও সর্বশেষ নভেম্বর মাসেও রেমিট্যান্স এসেছে ২০৭ কোটি মার্কিন ডলার। ফলে ম্যাজিক্যালি তাদের মুখেও কিন্তু চুনকালি পড়েছে।

এখন বিশ্বব্যাংকও ভোল পাল্টে বলছে, প্রবাস আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ এ বছর অষ্টম স্থানে থাকবে। বিশ্ব রেমিট্যান্স পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘কভিড-১৯ ক্রাইসিস থ্রু আ মাইগ্রেশন লেন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সাল নাগাদ বৈশ্বিক প্রবাস আয় ২০১৯ সালের মহামারির আগের চেয়ে ১৪ শতাংশ কমবে। বৈশ্বিক অর্থনীতি যেখানে চলতি বছর সংকুচিত হবে, সেখানে প্রবাস আয়ও স্বাভাবিকভাবেই কমবে। তবে বৈশ্বিক মহামারি সত্ত্বেও এ বছর বাংলাদেশের প্রবাস আয় বাড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র ১০ বছর ধরে এমন গতিতেই চলছে; ধারণাই করা যাচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতির মোড়লরা এখন বাংলাদেশকে তাই ‘ম্যাজিক অর্থনীতির’ দেশ বলছে। এই কারণে করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যে রেমিট্যান্স আয়ে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে চলেছে বাংলাদেশ। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। গত ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল চার হাজার ২০৯ কোটি (৪২.০৯ বিলিয়ন) ডলার, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের রিজার্ভ সবচেয়ে বেশি। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১২ ডিসেম্বর ভারতের রিজার্ভ ছিল ৫৭৯.৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতার বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে রিজার্ভকে এখন দেখাচ্ছে সরকার।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৪টি দেশে এক কোটি ৩০ লাখ কর্মী কর্মরত আছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ কর্মীই কাজ করছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। কভিডের ধাক্কা সেখানে লাগায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের মতো বাংলাদেশিরাও চাকরিহারা হয়েছেন।

বিদেশে এখনো কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত রয়েছে; কভিড স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কর্মসংস্থান খুব বেশি বাড়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে রোজই চাকরি হারিয়ে বিদেশ থেকে ফিরছেন কর্মীরা। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন লাখ ৬০ হাজার কর্মী বিদেশ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪ হাজারই নারী কর্মী।

সৌদি আরব থেকেই ফিরেছেন এক লাখ সাত হাজার কর্মী। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৯৭ হাজার, কাতার থেকে ৪১ হাজার, ওমান থেকে ২১ হাজার, মালয়েশিয়া থেকে ১৫ হাজার ৪১৬, মালদ্বীপ থেকে ১৫ হাজার, কুয়েত থেকে ১৪ হাজার ৬২২, ইরাক থেকে ১০ হাজার, লেবানন থেকে আট হাজার, সিঙ্গাপুর থেকে সাত হাজার ও বাহরাইন থেকে তিন হাজার কর্মী ফিরে এসেছেন।

সরকারি হিসাবে, প্রবাসী কর্মীর ৪৪ শতাংশ এখন দক্ষ। অদক্ষ কর্মী যাওয়ার হার আগের চেয়ে অনেক কমেছে। আগামী বছর কর্মী যাওয়া শুরু হলে দক্ষ কর্মী পাঠানোই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা জরুরি। পাশাপাশি করোনার কারণে বিশ্বে যেসব পেশার চাহিদা বেড়েছে, সেসব পেশায় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। কর্মী পাঠানোর সংখ্যা না বাড়িয়ে দক্ষতার দিকেই এখন বেশি নজর দিতে হবে।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com