মঙ্গলবার  ১৮ই মে, ২০২১ ইং  |  ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ৫ই শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরী

পৃ‌থিবী রক্ষা ও বিশ্বনেতৃত্বের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন

ধরিত্রীর বুকে সর্বনাশা মহামারির প্রবল তাণ্ডব চলছে। বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন আর বাস্তুতাত্ত্বিক অবনয়নজনিত অভিঘাত সহায়তায় কভিড-১৯ রীতিমতো সংহার মূর্তি ধারণ করেছে। জাতি-ধম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুঃসময়। উষ্ণায়ন, বাস্তুতাত্ত্বিক অবনয়ন আর কভিড-১৯-এর ত্রিমুখী ঝঞ্ঝায় মাতা ধরিত্রীর অবস্থা আজ টালমাটাল হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির প্রতিশোধ বিষয়টি মগজ থেকে আমরা একপ্রকার বের করেই দিয়েছিলাম। দিনের পর দিন ধরে পরিবেশের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি।

সুখ সুখ নামক খেলায় আমরা মত্ত হয়ে উঠেছিলাম। কভিড-১৯ আমাদের চৈতন্যে চাবুক মেরে দেখিয়ে দিল প্রকৃতি আর পরিবেশ বিরুদ্ধতার পরিণাম। এই মহামারি আগামী দিনে আরো বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস—এই সতর্কবার্তা বুঝতে ব্যর্থ হলে ধরিত্রীর বুকে মানুষের অস্তিত্ব এক চরম সংকটে উপনীত হবে। জাতিসংঘ বলছে, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ আত্মহত্যারই নামান্তর।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদনে (২০২০) বিগত দশকটি মানব ইতিহাসের উষ্ণতম দশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্রের উষ্ণতা পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলা অব্যাহত আছে। বছরে এর পরিমাণ পৌনে ৩০০ গিগাটনেরও বেশি। বরফঢাকা অঞ্চলগুলোর পার্মাফ্রস্ট (বরফ দ্বারা আবদ্ধ মাটি, শিলা, বালু ও অন্যান্য পদার্থ) গলে যাওয়ার কারণে সেসব জায়গার উদ্ভিদ তথা জৈবপদার্থ উন্মুক্ত হচ্ছে ও সেসব পচে গিয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন তৈরি হচ্ছে। ধ্বংসাত্মক দাবানল, বন্যা, সাইক্লোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী।

এ রকম একটি অবস্থায় এ বছর ধরিত্রী দিবসের (২২ এপ্রিল) প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘আমাদের ধরিত্রী পুনরুদ্ধার করি’ (জবংঃড়ত্ব ঙঁৎ ঊধত্ঃয)। এই প্রতিপাদ্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জাতিসংঘের মহাসচিবের কিছুদিন আগে দেওয়া এক বক্তৃতা (ডিসেম্বরে ২০২০) স্মরণ করলে বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, ‘জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ১০ লাখ প্রজাতি এখন অবলুপ্তির প্রহর গুনছে। আমাদের চোখের সামনে বাস্তুতন্ত্র হয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য। মরুভূমির বিস্তার ঘটছে। জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর আমরা এক কোটি হেক্টর বন হারাচ্ছি। অতি আহরণে সমুদ্রের মত্স্যভাণ্ডারে সৃষ্টি হয়েছে প্রচণ্ড চাপ। প্লাস্টিক দূষণে সমুদ্রের দম বন্ধ হয়ে আসছে।

মূল্যবান প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বায়ু ও পানিদূষণে বছরে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা বর্তমান মহামারির মৃত্যুর চেয়ে ছয় গুণ বেশি। মানুষ ও গবাদি পশু, বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে ঢুকে পড়ছে। বন্য প্রাণীর ভাইরাস কিংবা অন্যান্য রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।’ সন্দেহ নেই এসব তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মাতা ধরিত্রী কেমন আছে। ধরিত্রী দিবসের বার্তায় জাতিসংঘের মহাসচিব করোনাভাইরাস ও জলবায়ু পরিবর্তন উভয়ের বিরুদ্ধে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ধরিত্রীকে তার আগের ভারসাম্যময় অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারলে অনাগত বহু সমস্যাকে আমরা জয় করতে পারব। তবে এ জন্য দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও কিছু দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির কম ব্যবহার, পানি ও খাদ্যের অপচয় বন্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, বৃষ্টির পানি ব্যবহার, ভূমি ও জলাশয় দখলের মানসিকতা পরিত্যাগ, যেখানে-সেখানে স্থাপনা তৈরি না করা, দূষণ ঘটানো থেকে নিবৃত্ত হওয়া, বৃক্ষরোপণসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজ করার মাধ্যমে ধরিত্রী রক্ষায় ব্যক্তি পর্যায়ে আমরা অবদান রাখতে পারি।

বিধান চন্দ্র দাস

 

 

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com