সোমবার  ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ  |  ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ  |  ২৯শে সফর, ১৪৪৪ হিজরি

দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা যাবে না কেন: হাইকোর্ট

দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরে আসবে- এ আশাবাদ ব্যক্ত করে হাইকোর্ট বলেছেন, দেশ ভালো থাকলে আমরা সবাই ভালো থাকব। ভালো থাকার জন্যই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সুইস ব্যাংকে অর্থ জমাকারীদের বিষয়ে দেওয়া প্রতিবেদন নাম-পদবি ছাড়া দাখিল করায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান মাসুদ বিশ্বাস হাইকোর্টের তলবে হাজির হয়ে আজ বুধবার দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়ার সময় আদালত এসব কথা বলেন।

একই সঙ্গে কার্যকর অর্থ পাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিএফআইইউকে ‘গবেষণা সেল’ গঠন করার পরামর্শ দেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া বিএফআইইউ কোন কোন দেশের কাছে অর্থ পাচার ও পাচারকারীদের তথ্য চেয়েছে, কী তথ্য পেয়েছে, তথ্য পেয়ে থাকলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এবং পাচার করা অর্থ উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এসব বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে আগামী ২৬ অক্টোবর আদেশের জন্য রাখেন আদালত। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াত সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ও রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক।

গত ১০ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি শুয়ার্ড বলেন, সুইস ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য তথ্য চায়নি। সুইস ব্যাংকের ত্রুটি সংশোধনে সুইজারল্যান্ড কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে তিনি বলেন, সুইজারল্যান্ড কালো টাকা রাখার কোনো নিরাপদ ক্ষেত্র নয়।

সুইস রাষ্ট্রদূত বলেন, গত বছর সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা জমা হয়েছে। তবে উভয় দেশের সম্মতিতে ব্যাংকিং তথ্য লেনদেন হতে পারে এবং সেটা সম্ভবও। এটা নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন।

পরদিন বিষয়টি নজরে নিয়ে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমাকারীদের তথ্য কেন জানতে চাওয়া হয়নি, তা রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানাতে বলেন হাইকোর্ট। এরপর আদালতে দুদক এবং বিএফআইইউর পক্ষে হলফনামা আকারে তথ্য দাখিল করা হয়। ওই হলফনামায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় বিএফআইইউ প্রধানকে তলব করা হয়।

আজ হাজির হয়ে মাসুদ বিশ্বাস আদালতের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অসাবধানতাবশত এমনটি হয়েছে। আদালতে খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এদিন প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি। এমন ভুলের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে ব্যাপারে অঙ্গীকার করেন তিনি।

এ সময় আদালত বলেন, আদেশ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন আরও সতর্কতার সঙ্গে পাঠানো উচিত। বিএফআইইউ প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ক্ষমা চাইলে আদালত তাঁকে সতর্ক করে ভবিষ্যতে এমন হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান।

বিএফআইইউ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের এফআইইউ ও এগমন্ট গ্রুপের কাছে ৬৭ জনের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। আদালত এ প্রতিবেদন দেখে বিএফআইইউ প্রধানের কাছে জানতে চান, ৬৭ জনের নাম কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। জবাবে মাসুদ বিশ্বাস বলেন, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য এজেন্সি থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তখন আদালত বলেন, আপনার কাছে তো নির্ভুল তথ্য নেই। অনুমানের ভিত্তিতে আদালতে তথ্য দেওয়া যাবে না। মনে হয়েছে ৬৭ জনের নাম অনুমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর কমও হতে পারে, বেশিও হতে পারে। মাসুদ বিশ্বাস বলেন, বিভিন্ন ডাটা বিশ্লেষণ করে নামগুলো পেয়েছেন।

অর্থ পাচারকারীদের নাম এবং টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিএফআইইউ কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা যোগাযোগ করেছে কিনা, আদালতের এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি মাসুদ বিশ্বাস।

অর্থ পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত ভারতের ‘রামজিৎ মালানি বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলার রায় পড়ার পরামর্শ দিয়ে বিএফআইইউ প্রধানের উদ্দেশে আদালত বলেন, কেবল চিঠি চালাচালিই (বিভিন্ন দেশের এফআইইউকে) যথেষ্ট নয়। আইনের মধ্যে যথাযথ প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ না করলে ৫০ বছরেও অর্থ পাচার ও পাচারকারীদের তথ্য পাবেন না। তখন মাসুদ বিশ্বাস বিএফআইইউর কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, ২০১৭ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দুদক, এনবিআর এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ পর্যন্ত ৯৮৩টি ইন্টেলিজেন্স প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। বিদেশে ৬৪৪টি অনুরোধ পেয়েছেন। ১২৮টি আবেদন গ্রহণ করেছেন। ৭৯ বার এফআইইউ টু এফআইইউ যোগাযোগ হয়েছে।

আদালত এফআইইউ টু এফআইইউ চুক্তি হওয়া উচিত বলে অভিমত দিয়ে বলেন, ভারত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে ৭৮৪ জনের টাকা ফেরত এনেছে। টাকা ফেরত আনতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, আমাদের জানান। গবেষণা সেল তৈরি করে জানান।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com