সোমবার  ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ২০শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

দেশ ও প্রবাসে শোকের ছায়া ঃ হাসপাতালে মারা গেলেন কবি শহীদ কাদরী

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একুশে পদকপ্রাপ্ত বাংলা ভাষায় অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরী আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি… রাজিউন)। গত সপ্তাহে রক্ত সংক্রমণ জনিত কারনে তিনি নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ড এলাকার নর্থ শোর বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় রবিবার সকাল ৭টার দিকে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। প্রিয় কবির মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
কবিপত্নী নীরা কাদরী জানান, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মতে শুক্রবার কবির শারিরীক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। সেই সাথে ‘ইন্টারনাল ব্লিডিং’ বন্ধ হয়। পায়খানার সাথে রক্ত যাবার যে ভয়ংকর একটি অবস্থা চলছিল, সেটিও থেমে গিয়েছিল। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসার সাথে সাথে রক্তের চাপও হ্রাস পেয়েছিল। একই সাথে ৬টি এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল গ্রহণ করতে হয়েছিল কবিকে। ফলে চিকিৎসকরা কিছুটা সুফল পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন নীরা কাদরী। গত শনিবার বিকালে আবার তাঁর শারিরীক অবস্থার অবনতি ঘটে।
রবিবার সকাল ৭টার দিকে দেশ ও বিদেশের হাজারো ভক্তদের কাঁদিয়ে তিনি মারা যান। কবির মৃত্যুর খবরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কবি ভক্তরা তাঁকে এক নজর দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন কালের কন্ঠ।কে জানান, একুশে পদকপ্রাপ্ত বাংলা ভাষায় অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীকে হারিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে ক্ষতি সাধিত হলো তা কখনোই মেটানো সম্ভব হবে না। তিনি প্রয়াত কবির আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
এদিকে, নিউ ইয়র্ক কনসাল জেনারেল শামীম আহসান, এনডিসি কবির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তিনি ছুটে যান হাসপাতালে । তিনি কালের কন্ঠ’কে বলেন, একজন মহান ব্যক্তি ও বিখ্যাত কবিকে হারিয়ে দেশের একটি বড় ক্ষতি হলো। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে ক্ষতি সাধিত হলো তা কখনো আর ফিরে পাবো না। তিনি শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
বাংলা কবিতার অন্যতম জীবিত কিংবদন্তী কবি শহীদ কাদরী গত ১৪ আগষ্ট ৭৫ বছরে পা রাখেন। ১৯৪২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন কোলকাতার পার্ক সার্কাসে। ১০ বছর বয়সে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৫৩ সালে, মাত্র এগার বছর বয়সেই, ‘পরিক্রমা’ শিরোনাম দিয়ে তিনি একটি কবিতা লিখে ফেলেন, যেটি ছাপা হয় মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘স্পন্দন’পত্রিকায়। এরপর লিখেন, ‘জলকন্যার জন্য। সেটিও স্পন্দনেই ছাপা হয়। এভাবেই শুরু। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার বের হয় ১৯৬৭ সালে। তখন তাঁর বয়স ২৫ বছর। এই গ্রন্থে অবশ্য প্রথম রচিত কবিতা দুটি সন্নিবেশিত হয়নি। ‘উত্তরাধিকার’এ সংকলিত কবিতাগুলো কৈশোর এবং প্রথম যৌবনে রচিত হলেও ম্যাচিউরিটির কোনো অভাব নেই তাতে। একজন কবির বয়স যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ কবি শহীদ কাদরী। কবি শহীদ কাদরীর কবিতায় শরতের উপস্থিতি শরৎঋতু-বৈশিষ্ট্যের আবহে অবস্থান করেই তা কখনো বিপ্লবী, কখনো মানবিক আবার কখনো স্বপ্নচারী।`নশ্বর জ্যোৎস্নায় কবিতায় তিনি একটি সময়ের কথা বলেছেন যে সময় এখনো আসেনি। কবিতাটিতে তিনি যে চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তা বাংলার শরৎ ঋতুরই ছবি। `জ্যোৎস্নায় বিব্রত বাগানের ফুলগুলি, অফুরন্ত/হাওয়ার আশ্চর্য আবিস্কার করে নিয়ে/চোখের বিষাদ আমি বদলে নি’আর হতাশারে/নিঃশব্দে বিছিয়ে রাখি বকুলতলায়/সেখানে একাকী রাত্রে, বারান্দার পাশে/সোনালী জরির মতো জোনাকীরা নক্সা জ্বেলে দেবে’।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কোলকাতা শহরে জন্ম এবং সেখানেই কেটেছে প্রাক-কৈশোরের কিছুটা সময়। দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা শহরে অভিবাসন, তিন দশক এই শহরে অবস্থান, অতঃপর বার্লিন, লন্ডন, বোস্টন হয়ে নিউইয়র্কে বসবাস। তিনি একজন পরিপূর্ণ নাগরিক কবি । প্রকৃতপক্ষে গ্রামীন জীবনের স্বাদ গ্রহণ বা অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো সুযোগই তিনি পান নি। যে কারণে তার কাব্যভাষাটিও হয়ে উঠেছে শহুরে। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘কাব্যভাষা তৈরীর জন্য অভিজ্ঞতা লাগে, বই পড়ে নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরী হয় না।’ তাই তার কবিতায় শরৎ এসেছে নাগরিক দ্যোতনা নিয়ে।
এ যাবৎ প্রকাশিত শহীদ কাদরীর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা চারটি: ‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা , ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ এবং ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন সময়ে প্রবাসে রচিত কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’। অন্য তিনটি গ্রন্থের কবিতাগুলো তিনি রচনা করেন দেশ ছাড়ার আগেই অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের মধ্যেই। এই চারটি গ্রন্থে সন্নিবেশিত কবিতার সংখ্যা ১২২টি। এর পরে তিনি আরো চারটি কবিতা লিখেন। এর তিনটি ছাপা হয় ‘কালি ও কলম’-এ, অন্যটি প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায়। সব মিলিয়ে তার কবিতার সংখ্যা ১২৬টি। শালিক নাচে টেলিগ্রাফের তারে,/কাঁঠালগাছের হাতের মাপের পাতা/পুকুর পাড়ে ঝোপের ওপর আলোর হেলাফেলা/ এই এলো আশ্বিন,/আমার শূন্য হলো দিন/কেন শূন্য হলো দিন?/sk3মহাশ্বেতা মেঘের ধারে-ধারে/আকাশ আপন ইন্দ্রনীলে ঝলক পাঠায় কাকে?/ছাদে-ছাদে বাতাস ভাঙে রাঙা বৌ-এর খোঁপা/এই এলো আশ্বিন,/আমার শূন্য হলো দিন/কেন শূন্য হলো দিন?/শিউলি কবে ঝরেছিল কাদের আঙিনায়/নওল-কিশোর ছেলেবেলার গন্ধ মনে আছে?/তরুণ হাতের বিলি করা নিষিদ্ধ সব ইস্তেহারের মতো/ব্যতিব্যস্ত মস্তো শহর জুড়ে/এই এলো আশ্বিন,/আমার শূন্য হলো দিন/কেন শূন্য হলো দিন?’ এই কবিতায় কবি শহীদ কাদরী দিন শূন্য হবার কথা বলেছেন, দিন ফুরানোর ঘন্টাধ্বনি তিনি শুনতে পাচ্ছেন, যেমনি করে শরৎ পাতা ঝরিয়ে দিয়ে বৃক্ষকে শূন্য করে ফেলে। উল্লেখ করার মতো হচ্ছে, ‘আমার শূন্য হলো দিন’ এই পঙক্তিটির পরে প্রতিবারই তিনি আরো একটি প্রশ্নবোধক পঙক্তি লিখেছেন, ‘কেন শূন্য হলো দিন?’
এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে খেদ, ক্ষোভ, হতাশা। ‘দিন ফুরানো’ তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কবিতো তখন যুবক ছিলেন। তাহলে ‘দিন ফুরানোনিয়ে তার এতো আক্ষেপ কেন? প্রকৃতপক্ষে কবি অন্য এক ভবিতব্যের ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। দেশ ছাড়ার ঘণ্টাধ্বনি। তিনি এ-ও আঁচ করতে পেরেছিলেন যে তাঁর কবি জীবনের প্রায় যবনিকাপাত ঘটতে যাচ্ছে।
এরপর দীর্ঘ দীর্ঘ বিরতি। প্রায় তিন দশক পরে মাত্র ৩৬টি কবিতা নিয়ে ২০০৯ এ প্রকাশিত হয় ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’। সেইদিক থেকে শুধু দেশ ছেড়ে যাওয়াই নয়, যেন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার কবি জীবনের দিনও শূন্য হতে চলেছে। কোনো এক ঘন বর্ষণের দিনে কবি ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’ কবিতাটি লিখেছেন।
যে অবিরাম বর্ষণের কথা এই কবিতায় এসেছে তা কালবোশেখীর বৃষ্টি নয়, এই বৃষ্টি বর্ষার শেষে বা শরতের শুরুতেই দেখা যায়, যার গ্রোতধারায় ‘ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন/ভাঙা কাঁচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন/মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি/লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপসন, শাদা বাক্স ওষুধের/সৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার/ভবিতব্যহীন নানাস্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি’। কবি শহীদ কাদরী ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com