রবিবার  ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং  |  ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

দেশে ভয়াবহ হারে বাড়ছে মানসিক রোগী : ৩৪% মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত

ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মানসিক রোগ। দেশে প্রতি ১০০ জনের ৩৪ জনই মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। ক্রমান্বয়ে এ হার বেড়েই চলেছে। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণের সংখ্যাই বেশি। বিষণ্নতা ও অবসাদে ভোগা এসব রোগীর অনেকে একপর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। জড়িয়ে পড়ছেন মাদক, ধর্ষণ, জঙ্গিবাদসহ নানা অপরাধে। বেকারত্ব, পরিবার ও কর্মস্থলে অবহেলা, পারিবারিক অশান্তি, যৌথ পরিবার ভেঙে সম্পর্কের বন্ধন আলগা হওয়া, মাদকের আগ্রাসন, জীবনযাপনে প্রযুক্তির অতি নির্ভরতাকে মানসিক রোগের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ বুলেটিন-২০১৮ এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ১৬ দশমিক ১ ভাগ মানসিক রোগে ভুগছেন। আর ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ ভাগই মানসিক রোগে আক্রান্ত। অন্যদিকে ২০০৯ সালে হওয়া সর্বশেষ জাতীয় সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা এখন কয়েক গুণ বেড়েছে। আর পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি এক লাখ মানুষে ৬ জন আত্মহত্যা করছে মানসিক সমস্যার কারণে। মানসিক রোগের কারণে এখন সন্তানের হাতে বাবা-মা আর বাবা-মায়ের হাতে সন্তান খুনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। খুন, ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। অবসাদে ভোগা এসব রোগী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো অবসাদগ্রস্ত এসব তরুণকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে সহজে জঙ্গিবাদে লিপ্ত করছে। এ্যাপোলো হসপিটালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. নিগার সুলতানা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০১৩ সালে তিনি যত রোগী দেখেছেন তার ১১ শতাংশ চূড়ান্ত পর্যায়ের বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। সেই হার ২০১৫ সালে এসে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। দুই বছরে বেড়েছে প্রায় চারগুণ। পরিসংখ্যান না থাকলেও এখন এটা আরও বেড়েছে। একপর্যায়ে এসব রোগীর অনেকে বিষণ্নতা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে তার আচরণে নানা পরিবর্তন আসে। সারাক্ষণ মন খারাপ থাকা, কোনো কাজে উৎসাহ না পাওয়া, খাওয়া-দাওয়ার ইচ্ছা কমে যাওয়া, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, নিজের যতœ নিতে ইচ্ছা না করা, যে কোনো বিষয় ভুলে যাওয়া- এগুলো সবই মানসিক সমস্যার লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে সবসময় বড়দের মতো লক্ষণ না-ও থাকতে পারে। কিন্তু প্রায়ই শরীর খারাপের নানা অভিযোগ থাকে। ডাক্তারের কাছে নিলে রোগ পাওয়া যায় না। মানসিক সমস্যার কারণে এমনটা হতে পারে। আমরা শিশুটির সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারি। এখন অনেক বাবা-মা এমন সমস্যা নিয়ে আসছেন। এর মধ্যে প্রচুর সাইবার আসক্তির রোগী পাচ্ছি। তারা মোবাইলে, ল্যাপটপে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, গেম, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। কত বছর বয়সে একটা বাচ্চার হাতে মোবাইল দেওয়া হবে তার একটা নীতিমালা থাকা দরকার। বড়রা হয়তো দেখছেন, শিশুটি গেম খেলছে, কিন্তু সে নিজের অজান্তেই এমন একটা আসক্তিতে ঢুকে পড়ছে যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এ জন্য সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের ভালো যোগাযোগ থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেকারত্ব, হতাশা, জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি দুর্বলতায় বাড়ছে মানসিক অস্থিরতা। ব্যক্তিজীবনের অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, নানামুখী চাপ, কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, অপ্রাপ্তি, লোভ, বিচারহীনতা মানুষকে হতাশায় ডুবিয়ে মানসিক রোগীতে পরিণত করছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগী বাড়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই কারণগুলো।’ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উদ্বেগাধিক্যতে ৮ দশমিক ৪, বিষণ্নতার চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪ দশমিক ৬, গুরুতর মানসিক রোগে ১ দশমিক ১ এবং মাদকাসক্তিতে শূন্য দশমিক ৬ ভাগ লোক ভুগছেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে বাচ্চারাই আমাদের সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট। পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া ও প্রযুক্তিনির্ভরতায় মানসিক রোগ বাড়ছে। ১৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যেই একজন মানুষের মানসিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়ে যায়। জীবন দক্ষতা, চাপ নেওয়ার ক্ষমতা, শিশুটি বড় হয়ে কতটা সমস্যা মোকাবিলা করে সামনে যেতে পারবে সেই সক্ষমতা তৈরি হয় এই বয়সেই। তাই বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় মাদক, পর্নোগ্রাফি, জঙ্গিবাদসহ নানা অপরাধ তাদের হাতছানি দেয়। তিনি বলেন, আগে যৌথ পরিবারে শিশুরা অনেক মানুষের সঙ্গে হেসে-খেলে, গল্প করে বড় হতো। বড়দের থেকে ভালো-মন্দ বুঝতে শিখত। মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা তৈরি হতো। সামাজিকতা শিখত। এখন একক পরিবারের আধিক্যের কারণে শিশুদের মেশার জায়গা কমে গেছে। তারা ঝুঁকিপূর্ণ বয়সটা মোবাইল, ল্যাপটপ, গেম, ফেসবুকের সঙ্গে পার করছে। তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ে উঠছে। এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ তৈরি করছে। ভার্চুয়াল জীবন তাদের মধ্যে এমন এক কল্পনার জগৎ তৈরি করছে, যা বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল নেই। ওই শিশুটি বড় হয়ে বাস্তব জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে অবসাদে ভুগছে। এটা শুধু ওই শিশু-কিশোরের জীবনেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না, সমাজের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com