শিরোনাম
সোমবার  ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং  |  ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ১৯শে সফর, ১৪৪৩ হিজরী

তালেবানের বিজয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তন

খুব দ্রুত তালেবানের আফগানিস্তান দখল বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞদের স্তম্ভিত করেছে। তালেবানের হাতে কাবুলের পতনের পর দুই দশকের কর্মযজ্ঞ এবং বিনিয়োগকে পেছনে ফেলে বিভিন্ন দেশ তড়িঘড়ি করে তাদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে সরিয়ে নিচ্ছে।

তালেবানের জয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। এটি বিশেষ করে ভারতের জন্য একটি পরীক্ষা হতে পারে। কারণ পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবেই দেশটির সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ, সীমান্ত বিরোধও রয়েছে। উভয় দেশই ভবিষ্যত আফগানিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হচ্ছে।

বিবিসি’তে সাংবাদিক বিকাশ পান্ডের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। আফগানিস্তান: দ্য তালেবান’স ভিক্টরি উইল টেস্ট ইন্ডিয়া, এন্ড পিস ইন সাউথ এশিয়া- শীর্ষক প্রতিবেদনটির সম্পূর্ণ এবং হুবহু বাংলা অনুবাদঃ

আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে উত্তরের প্রতিবেশীটির বিষয়ে দেশটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন চীন আফগানিস্তানে বড় ধরনের ভূমিকা পালনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত মাসে সিনিয়র তালেবান নেতাদের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এর বৈঠক থেকে বুঝা যাচ্ছে যে বেইজিং আর নীরব খেলোয়াড় হয়ে থাকতে চায় না।

আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেছেন, এই সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন “সবকিছু উল্টে দিতে পারে”।

মূলত, আফগানিস্তান ছিল- কাবুলের গণতান্ত্রিক সরকার, পশ্চিমা বিশ্ব এবং ভারতের মতো অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে একটি দুর্বল জোট।

কিন্তু বিশ্ব সম্ভবত এ খেলার পরবর্তী রাউন্ডে পাকিস্তান, রাশিয়া, ইরান এবং চীনকে একসাথে খেলতে দেখতে পাবে।

ভারতের কেউ কেউ এটাকে দিল্লির জন্য হার এবং পাকিস্তানের জন্য বড় জয় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক জিতেন্দ্র নাথ মিশ্র বলেছেন, এটি খুব সরল দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ পশতুন নেতৃত্বাধীন তালেবান আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তকে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি যা ইসলামাবাদের জন্য অস্বস্তিকর।

তিনি বলেন, “পাকিস্তান চাইবে তালেবানরা সীমান্ত মেনে নিক এবং এটি হবে তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার”।

ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টার থিংক-ট্যাঙ্কের উপ-পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, কিন্তু এটাও সত্য যে আফগানিস্তানে তালেবানের শাসন পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা দেবে। ইসলামাবাদ সবসময় যা চেয়ে এসেছে তাই তারা পেয়েছে- আফগানিস্তানে এমন একটি সরকার যাকে সে সহজেই প্রভাবিত করতে পারে।

কুগেলম্যান বলেন, “পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এটাকে ভারতের জন্য ক্ষতি হিসেবে দেখাতে পারেন, কিন্তু এটি ছাড়াও পাকিস্তানের আরও বড় কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে। এই মুহূর্তে দেশটি নিজেকে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বিজয়ী বলে মনে করছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক অথবা ইসলামাবাদের সাথে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির হালকা সম্পর্ক নিয়ে পাকিস্তান খুশি ছিল না। দেশটির ভগ্ন অর্থনীতির কারণেও সে নিজেকে দুর্বল মনে করেছে।

জিতেন্দ্র নাথ মিশ্র বলেন, “এখন ইসলামাবাদের বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে তারা বিজয়ী কারণ চীনের সাথে তাদের “সব পরিস্থিতির” বন্ধুত্ব আফগানিস্তানে কাজে লাগবে। তাছাড়া, বেইজিং এখন আর তার শক্তি প্রদর্শনে লজ্জা পায় না। চীন এখন তার নিজস্ব নিয়মে খেলতে পারবে এবং সে তাই করবে।”

আফগানিস্তানে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে, যা তার ক্রমবর্ধমান খনিজের চাহিদা পূরণে তাকে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো তালেবানকে চীন ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম) নিষিদ্ধ করার জন্য চাপ দিতে পারবে, যাকে সে নিজের মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়ানে অস্থিরতার জন্য দায়ী করে থাকে। আফগানিস্তান থেকে সংগঠনটি যেনো পরিচালিত না হতে পারে, সে ব্যাপারে চাপ দিতে পারে চীন।

গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, চীন এবং পাকিস্তান “আফগানিস্তানে একে অপরের কাঁধে চড়বে”। কিন্তু তিনি আরও বলেন, বেইজিংকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে সে অতীতের অন্যান্য বিশ্বশক্তির মতো কোনো ফাঁদে না পড়ে।

রাশিয়া এবং ইরানের অবস্থা একইরকম বলে মনে হচ্ছে- তারা তাদের দূতাবাসও সরিয়ে নেয়নি এবং উভয় দেশের কূটনীতিকরা এখনও কাবুলে কাজ করছেন।

তাহলে প্রশ্ন হলো, ভারত এখন কি করতে পারে? পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার মতো আফগানিস্তানে ভারত কখনোই বড় খেলোয়াড় ছিল না। কিন্তু দিল্লি বরাবরই নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন উন্নয়নে কাজ করেছে। শিক্ষা, কাজ বা চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার আফগানি ভারতে রয়েছেন।

জিতেন্দ্র নাথ মিশ্র বলেন, দিল্লির জন্য ভালো কোন বিকল্প নেই। “যা আছে তা হলো খারাপ বিকল্প বা আরও খারাপ বিকল্প।”

তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি হবে না, সেটাই ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিদ্ধান্তটি নেয়া কঠিন হবে, বিশেষ করে যদি মস্কো এবং বেইজিং কোনোভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামাবাদ সম্ভবত তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে, যেমনটি ১৯৯৯ সালে করেছিল।

এই মুহূর্তে ভারতের জন্য সেরা বিকল্প মনে হচ্ছে- তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের একটি চ্যানেল খোলা রাখা। কিন্তু তালেবান এবং দিল্লির মধ্যকার ইতিহাস বিবেচনা করলে এটি হবে অস্বস্তিকর এক সম্পর্ক। তালেবান ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এর একটি বিমানের ছিনতাইকারীদের নিরাপদে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। এটি এমন এক ঘটনা যা ভারতীয়দের ‘সম্মিলিত স্মৃতি’তে রয়ে গেছে। আবার দিল্লি সবসময় আফগান যুদ্ধবাজ দল ‘নর্দার্ন অ্যালায়েন্স’ এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে – যারা ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।

ভারত এখন তার নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য এবং এই অঞ্চলটি যাতে স্থিতিশীল থাকে তা নিশ্চিত করতে অতীতকে আলাদা রাখতে পারে। জাইশ-ই-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তৈয়বার মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো তালেবানদের সাফল্যে উজ্জীবিত হতে পারে এবং ভারতের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং আফগানিস্তান নিয়ে বইয়ের লেখক অমলেন্দু মিশ্র বলেন, কূটনৈতিক কড়াকড়ির মধ্যেই ভারতকে চলতে হবে।

কাশ্মীরের বিতর্কিত অঞ্চল যেনো মুজাহিদিনের পরবর্তী সমাবেশস্থলে পরিণত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতকে তালেবানদের সাথে কথা বলা দরকার, কিন্তু তাকে এই সিদ্ধান্তও নিতে হবে যে সে কতোটা তালেবান বিরোধী গোষ্ঠীর সাথে জড়িত হতে চায়। তালেবানের ওপর চাপ রাখার জন্য পশ্চিমারা যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে পারে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইতিমধ্যেই তালেবান সরকারের প্রতি ‘যৌথ জবাবদিহিতা’র আহ্বান জানিয়েছেন।

এছাড়া অন্যান্য আরো সম্ভাবনা রয়েছে, যেমন পরবর্তীতে ‘নর্দার্ন অ্যালায়েন্স’ এর পুনর্গঠন। আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব এবং চীন-রাশিয়া-পাকিস্তান যৌথ গ্রুপের আধিপত্যের লড়াইয়ের আরেকটি স্থান হয়ে উঠছে।

সুতরাং, ভারতের জন্য কোন সহজ বিকল্প নেই। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক শান্তি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com