মঙ্গলবার  ১৮ই মে, ২০২১ ইং  |  ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ৫ই শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরী

ক‌রোনা সম‌য়ের অনুভু‌তি : মনুষ্যত্ব পচার গন্ধ পাই

আমি মনুষ্যত্ব পচার গন্ধ পাই।
___________________________

মনটা খুব খারাপ। কারন ভেবেছিলাম রোজার শুরুর দুই তিন দিন আগে গিয়ে আব্বা আম্মাকে রোজার বাজার নিজ হাতে করে দিয়ে আসবো। কিন্তু রাজশাহী এসে লকডাউনে পড়লাম। কি আর করার যতটুকু সম্ভব মোবাইলে টাকা দিয়েছি বাজার করে নেওয়ার জন্য। বয়স্ক মানুষ না জানি কি করছে!

কি যে শুরু হইলো চারিদিকে! করোনার তাণ্ডব তো চলছেই, সেই সাথে চলছে হেফাজত, রাজনৈতিক সহ নানান ইস্যু নিয়ে তাণ্ডব। ঘোলা জলে কেউ কেউ ব্যস্ত মাছ শিকার করা নিয়ে। আর আমরা আমজনতা ঘরে বসে করোনার ভয়ে। কিন্তু বিষয় এটা নয়। চিন্তার বিষয় হলো এটাই যে এভাবে কতদিন চলা যায়!?
হরেক রকম সমস্যার মধ্যে দিয়েও বন্ধ পড়াশোনা আবার শুরু করেছিলাম। ভেবেছিলাম বিএ পাশটা করলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোটামুটি ভালো পদে চাকরির জন্য চেষ্টা করতে পারবো।
কিন্তু ঐ যে ‘অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়!’ বিএ ফাইনাল পরীক্ষা গত বছর থেকে করোনায় ঝুলে আছে। ঝুলন্ত বাবু হয়ে বয়সটা ২০২১ সালের এপ্রিলের দশ তারিখে তিরিশ পার হলো। করোনাতে না পারছি চাকরি খুঁজতে, পা পারছি নিশ্চিন্তে ঘরে বসে থাকতে। এখন যেখানে কর্মজীবি মানুষই কর্মহীন হয়ে পড়ছে, সেখানে কর্মহীন মানুষদের কর্ম পাওয়া কত যে কঠিন তা হারে হারে বুঝতেছি। তার উপর সুযোগ সন্ধানী মানুষ তো ওঁত পেতে থাকেই, করোনাতে তাদের সংখ্যা আরোও বাড়া ছাড়া কমেনি।
আব্বা আম্মা ফোন করে জানতে চায় চাকরি পেলাম কিনা! জানতে চায় কিছু টাকা পাঠাতে পারবো কিনা! যে আব্বা আম্মাকে চাওয়ার আগেই দিতাম। সেই আব্বা আম্মাকে যখন বার বার চাইতে হয় আমার কাছে, তখন কষ্ট লাগে মনে।

বর্তমানে অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, আমরা সাধারণ মানুষ কোন কিছু বিক্রি করতে গেলে করোনার এক্সকিউজ দিয়ে দাম কম দেয়। আবার কিন্তুে গেলেও করোনার এক্সকিউজ দিয়েই দাম চড়া নেয়।
সব মিলে মনে হচ্ছে শশ্মান ঘাটে যেনো আলু পোড়ানোর ধুম লেগেছে। এই সুযোগে স্বার্থপর, বাটপাড়েরা করোনাকে পুঁজি করে নিজের পকেট ভর্তি করতে ব্যস্ত। কিন্তু এটা ভাবছেনা করোনা কাউকে ছাড় দেয়না। এই করোনায় কত কত মানুষ হুটহাট করে চলে যাচ্ছে টাকা, সম্পদ ফেলে খালি হাতে। এসব দেখেও হুশ হয়না তাদের। রোজার মাস এলেই খাদ্য দ্রব্য সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্যতে যেনো আগুণ ধরে।
যাদের টাকা নামক পানি আছে, তারা সেই আগুন নিভিয়ে ঘরে তোলেন দ্রব্য। আর সাধারণ মানুষ তাপে আশেপাশে যেতেও ভয় পায়। এই করোনাকালীন রোজাতেও এর বিপরীত হয়নি। এই করোনাতেও যদি বিবেকহীনদের বিবেক না ফিরে তাহলে আর মনে হয় না কখনো ফিরবে।

করোনা নামক ফাটা বাঁশে সবচেয়ে বেশি চিপা খাচ্ছি সাধারণ জনগণ। বিশেষ করে যারা না পারছে কারও কাছে চাইতে, না পারছে চলতে।

আমরা এমন জাতি যে চালের বস্তা পুকুরে ফেলবো, তবু দিবোনা অসহায় মানুষকে। পেয়াজের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে দামে আগুন লাগাই। অথচ গোডাউনে পেয়াজকে বন্দী করে রাখি বস্তায় বস্তায়। তারপর পেয়াজ যখন বস্তার মধ্যে থেকে মুখ খোলে অথবা প্রশাসনের ভয়ে ঠ্যালায় পড়ে রাতের অন্ধকারে পচা পেয়াজ রাস্তায় ফেলে যাই।
সকালে পথিক পচা পেয়াজের গন্ধ পায়। কিন্তু আমি পচা পেয়াজের পাশে দাঁড়িয়েও পচা পেয়াজের গন্ধ পাইনা। আমি মনুষ্যত্ব পচার গন্ধ পাই। আমাদের মানসিকতা দিনের দিন কৃত্রিম হয়ে যাচ্ছে। আর বিবেক যাচ্ছে পচে। যে পচা বিবেকের গন্ধ আমরা রাস্তায় পড়ে থাকা পচা পেয়াজের মধ্যে পাই।

তবুও এর মধ্যেও কিছু কিছু ভালো মানুষ আছে বলে এখনও আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি নিজেকে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

ফেসবুক থে‌কে সংগ্রহ : প‌রিনা পি এস

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com