বুধবার  ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ১৮ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

কাশ্মীরে ভারত সরকারের আগ্রাসন : বদরুদ্দীন উমর

৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখে ভারতের নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা পার্লামেন্টের দুই পক্ষের ভোটে বাতিল করেছে।

এর মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল তা বাতিল করা হয়েছে এবং কাশ্মীরকে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এ দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। তারা এই পদক্ষেপ হঠাৎ করে গ্রহণ করেনি।

এর ফলে কাশ্মীরকে তারা পরিপূর্ণভাবে গ্রাস করে ভারতের সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন এবং তাদের সব আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে শিকেয় তুলেছেন।

৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা এভাবে বাতিল করার পর তারা কাশ্মীরের জনগণের প্রতিরোধ সামাল দেয়ার উদ্দেশ্যে কাশ্মীরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সেখানকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বন্দি করেছেন এবং কাশ্মীরের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অংশ এবং দুনিয়ার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন।

কাশ্মীরের জনগণের ওপর এক চরম নির্যাতন জারি রেখেছেন। কিন্তু এই নির্যাতন সত্ত্বেও কাশ্মীরের জনগণ এখন ভারত সরকারের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ নতুন পরিস্থিতিতে শুরু করেছেন।

জওহরলাল নেহেরু কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে গণভোটের সব সম্ভাবনা শেষ করে তাকে একটি ভারতশাসিত অঞ্চলে পরিণত করেছিলেন।

পরবর্তীকালে ভারত সরকার কাশ্মীরে যে নীতি কার্যকর করে এসেছে তার ধারাবাহিকতাতেই এখন নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সম্ভব হয়েছে কাশ্মীরকে পরিপূর্ণভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা।

জওহরলাল নেহেরু তাদের নৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক অনেক হামবড়া কথাবার্তা সত্ত্বেও মূলত ছিলেন একজন ফ্যাসিস্ট ও সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তার নেতৃত্বেই কংগ্রেস কাশ্মীরে তাদের সাম্প্রদায়িক নীতি কার্যকর করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তার অনিবার্য পরিণতিই ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে বর্তমান পদক্ষেপ গ্রহণে।

এদিক দিয়ে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। তারা উভয়েই হিন্দুত্ববাদী নীতির ভিত্তিতে তাদের কাশ্মীর নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করে এসেছেন।

এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা দরকার। ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন গোলওয়ালকার। তার আগে সাভারকার হিন্দুত্ববাদের ওপর প্রথম তত্ত্ব খাড়া করেন। তিনি ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদী সরকারকে আখ্যায়িত করেন হিন্দুদের লিবারেটর বা পরিত্রাতা হিসেবে।

তার মতে পুরো মুসলিম শাসন ছিল হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস। এজন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে তার কোনো বক্তব্য ছিল না। উপরন্তু তিনি ছিলেন তাদের এক ধরনের সমর্থক। তবে সন্ত্রাসবাদী আচরণের কারণে ভারতীয় ব্রিটিশ সরকার তাকে কিছুদিন আন্দামানে বন্দি রাখে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কংগ্রেস সরকার এজন্য আন্দামানের সেলুলার জেলে তার সম্মানে ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক স্মৃতিফলক স্থাপন করে! এই ছিল সাভারকারের প্রতি কংগ্রেস সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, গান্ধীর হত্যার পর তার অন্যতম চক্রান্তকারী হিসেবে সরকার তাকে বন্দি করে। আরএসএসকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু অল্পদিন পরই তারা সাভারকারকে মুক্তি দেয় এবং আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি। তাকে জওহরলাল নেহেরু তার সরকারের মন্ত্রী করেন! এর থেকে বোঝার অসুবিধে নেই যে, কংগ্রেস তার ঢাকঢোল পেটানো অসাম্প্রদায়িকতা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে হিন্দু মহাসভার বিরোধী ছিল না।

অথচ আরএসএস গঠিত হওয়ার আগে থেকে হিন্দু মহাসভাই ১৯৪৭ সাল এবং তার পরও ছিল হিন্দুত্ববাদের প্রধান ধারক-বাহক। ১৯৯২ সালে আরএসএসের করসেবকদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কোনো বিরোধিতা কংগ্রেস সরকার করেনি।

তারা ইচ্ছা করলেই সামরিক বাহিনী বা পুলিশ দিয়ে সে সময় বাবরি মসজিদের এলাকা ঘেরাও করে রাখতে পারত, তাহলে আর মসজিদ ধ্বংস করা সম্ভব হতো না। এ সময় কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও পরিস্থিতি মোকাবেলার কোনো চেষ্টা না করে সারাদিন তার বাড়ির পুঁজোর ঘরে কাটান এবং বের হন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ শেষ হওয়ার পর!

এর থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, শুধু আরএসএসই নয়, কংগ্রেস সরকারও ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পক্ষে। এখানে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হল। কিন্তু দেখা যাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোর প্রতি তাদের নরম দৃষ্টিভঙ্গি।

কার্যত তারা তাদের সাম্প্রদায়িক নীতিই কার্যকর করে হিন্দুত্ববাদের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এর থেকে এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য যে, কংগ্রেস নিজেও ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল এবং প্রকৃতপক্ষে তারা এবং হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ছিল একই পালকের পক্ষী।

জওহরলাল নেহেরু প্রথম থেকে কাশ্মীরে যে নীতি অনুসরণ করেন সেটা ছিল তাদের সাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রতিফলন। এ কারণে ভারত বিভক্ত হওয়ার সময় কাশ্মীরকে নিয়ে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তাতে তারা সেখানে গণভোটের জাতিসংঘ প্রস্তাবের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত নেহেরু গণভোটের বিষয়টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও বাতিল করেন।

গণভোট বাতিল করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির মধ্যে নেহেরু যে পরিবর্তন এনেছিলেন তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার এখন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজ করে সে অঞ্চলটিকে পুরোপুরিভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ইটালির ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনি ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, কোনো দেশে সরকার ও কর্পোরেটগুলোর একীভূত হওয়ার নামই ফ্যাসিবাদ।

এখন ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের চরিত্রের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই সরকারের সঙ্গে ভারতীয় কর্পোরেট হাউসগুলো যেভাবে একীভূত হয়েছে এমনটা ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি, যদিও কংগ্রেস সরকারও এই কর্পোরেট হাউসগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত থেকেছে। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েই কর্পোরেট হাউসগুলোর সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

সে কারণেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনে প্রভূত অর্থ সাহায্য করে। সে সময় নরেন্দ্র মোদি যে পরিমাণ অর্থ নির্বাচনের জন্য ব্যয় করেছিলেন, সেটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যা ব্যয় হয়েছিল তার সমপরিমাণ।

আমেরিকার থেকে ভারতে এই অর্থশক্তির ভূমিকা ছিল আরও অনেক বড়। এখানে বলা দরকার যে, নরেন্দ্র মোদি গুজরাটকে পরিণত করেছিলেন ভারতের সব থেকে বেশি শিল্পায়িত রাজ্যে। এটা ছিল তার এক বড় ব্যক্তিগত কৃতিত্ব।

কিন্তু এর সঙ্গে তিনি গুজরাটের জনগণের দুরবস্থা এমনভাবে সৃষ্টি করেছিলেন, যা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের থেকে ভয়াবহ। এই পরিস্থিতি এখনও চলছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে, ২০০২ সালে গুজরাটে এক ভয়ঙ্কর মুসলিমবিরোধী কর্মসূচির মাধ্যমে মোদি সরকারের আমলে চক্রান্তমূলকভাবে অসংখ্য মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল।

তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সারা বিশ্বে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছিল নরেন্দ্র মোদির বিরোধী। ২০০২ সালের পর তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করলে তার আবেদন তারা প্রত্যাখ্যান করে।

তাকে তারা কোনো ভিসা দেয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা না দেয়ার বিরুদ্ধে ভারতের তৎকালীন ‘অসাম্প্রদায়িক’ কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারিভাবে প্রতিবাদ করেন। এসব থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার ভারতে ‘অসাম্প্রদায়িক’ কংগ্রেস সরকারেরই পরবর্তী সংস্করণ।

কাশ্মীরে এখন জনগণের সব ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। কাশ্মীরের অভ্যন্তরে এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তারা সব যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে তারা গ্রেফতার করেছে।

তারা কাশ্মীরের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ফারুক আবদুল্লাকে গৃহবন্দি করেছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, এর ঠিক পূর্বেই নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরে মেহবুবা মুফতির দলের সঙ্গে বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিলেন।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা বাতিল করে এখন কাশ্মীরকে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর সঙ্গে এককাতারে এনে দাঁড় করানো হয়েছে। আগে কাশ্মীরে ভারতীয়দের জমি কেনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, চাকরি নিষিদ্ধ ছিল।

এখন ভারতীয়রা সেখানে জমি কিনতে পারবে, ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারবে, চাকরি করতে পারবে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের লোকদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করে কাশ্মীরিদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরও পেছনে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তাছাড়া এক্ষেত্রে তাদের একটা বড় চক্রান্ত হচ্ছে, কাশ্মীরে ভারতীয় হিন্দুদের বসতি স্থাপন করে সেখানে মুসলমানদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা। কর্পোরেট হাউসগুলোর জন্য কাশ্মীরে বড় আকারে বিনিয়োগের পথ পরিষ্কার করা হয়েছে।

এটাই স্বাভাবিক, কারণ ভারতে এখন সরকারের সঙ্গে কর্পোরেটগুলো একীভূত হয়ে সেখানে তাদের জন্য ব্যাপক লুটতরাজের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

সরকারের সঙ্গে কর্পোরেটগুলো একীভূত হয়ে এখন কাশ্মীরের জনগণকে শোষণ-নির্যাতনের ব্যবস্থা পাকা করেছে। ভারত সরকার এখন যে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকারে পরিণত হয়েছে তাতে এটাই স্বাভাবিক।

১৮.০৮.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com