মঙ্গলবার  ১৮ই মে, ২০২১ ইং  |  ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ  |  ৫ই শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরী

করোনা পরামর্শ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ভিটামিন ডি

ভিটামিন ডি হাড়ের কাঠামো তৈরি ও ঘনত্ব বৃদ্ধিতে প্রভূত ভূমিকা রাখে। নাম শুনে ভিটামিন মনে হলেও ভিটামিন ডি আসলে একটি স্টেরয়েড হরমোন। অন্যান্য ভিটামিন যেখানে অ্যান্টিঅক্সিজেন বা কো-অ্যানজাইম হিসাবে কাজ করে, ভিটামিন ডি সেখানে জিন এক্সপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ দেহের প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকে। প্রাণিজ ও উদ্ভিদজাত স্টেরল ও ফাইটোস্টেরল সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি দ্বারা রূপান্তরিত হয়ে দেহে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ভিটামিন ডি-২ ও ভিটামিন ডি-৩ মানবদেহে থাকে।

বড়দের যেমন ভিটামিন খুবই দরকার, শিশু-কিশোরদের শরীরেও পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি-র উপস্থিতি তাদের শরীর গঠন, রোগ প্রতিরোধক্ষম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি, দৈহিক স্থূলতা এ সবকিছুর সঙ্গে ভিটামিন ডি নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই কমবয়সি শিশু-কিশোরদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস ক্রমেই বেশি মাত্রায় দেখা দেওয়ার পেছনে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি একটি বড় কারণ হয়ে থাকতে পারে। ভিটামিন ডি-র ঘাটতিতে কোনো কোনো ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। এটা নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, ভিটামিন ডি-র অভাবে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। সারা পৃথিবী এখন করোনা মহামারিতে আক্রান্ত। এখানে একটি বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট-যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত কম, তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততো বেশি। শুধু তাই নয়, রোগ প্রতিরোধ কম থাকা কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তার মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।

ভিটামিন ডি-র ভূমিকা : যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক গবেষণায় করোনা থেকে রেহাই পেতে প্রতিদিন সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য এবং ভিটামিন সি ও ডি-সহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ সূত্র ধরে ডায়াবেটিস রোগী তো বটেই, অন্যদেরও এ করোনা মহামারিকালে অন্যান্য উপকারী খাদ্য উপাদান গ্রহণে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে। এসব খাদ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- স্যামন, সার্ডিন ও টুনা মাছ, মাশরুম, ডিম, টক দই, গরুর কলিজা ইত্যাদি। এছাড়া ভিটামিন ডি-র অন্যতম উৎস সূর্যালোক। দেশে প্রচুর সূর্যালোক থাকার পরও বহু মানুষ ভিটামিন ডি-র ঘাটতিতে ভুগছেন। সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি পেতে হলে মার্চ-অক্টোবর মাসে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট রোদ পোহাতে হবে, যখন শরীরের ১৮ শতাংশের বেশি অংশে রোদ লাগবে। অন্যান্য মাসে আরও বেশি সময় ধরে রোদ পোহাতে হবে। ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের গড়ে প্রতিদিন ৬০০ আইইউ এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিদের ৮০০ আইইউ ভিটামিন ডি গ্রহণ করা দরকার।

ভিটামিন ডি ওষুধ হিসাবে খেতে হবে যাদের : ১. নবজাতক যারা শুধুই মায়ের দুগ্ধ পান করছে এবং যারা ১০০০ মিলিলিটারের কম শিশুখাদ্য গ্রহণ করে; ২. শিশু-কিশোর যারা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা নগরে বা অস্বাস্থ্যকর শহরে (যেমন ঢাকা) বসবাস করছে; ৩. দৈহিকভাবে স্থূল শিশু-কিশোর, যাদের ত্বকের বিভিন্ন অংশে মখমলের মতো কালো অংশ দেখা দিচ্ছে; ৪. ধর্মীয় বা অন্য কারণে পোশাকে প্রায় সারা দেহ আবৃত শিশু-কিশোর; ৫. খাদ্যনালির সমস্যার কারণে কারও হজম ও বিপাকীয় কার্যক্রম হ্রাস পেলে; ৬. প্রাতিষ্ঠানিক জীবনযাপনের (হোস্টেল, হাসপাতাল বা অফিস) কারণে যাদের রোদে যাওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং ৭. যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।

ভিটামিন ডি-র ঘাটতি খুব বেশি হলে ৪০ হাজার আইইউ ক্যাপসুল সপ্তাহে এবং পরবর্তীকালে মাসে একটি করে খেয়ে যেতে হবে। ঘাটতি কম হলে ২০ হাজার আইইউ ক্যাপসুলই যথেষ্ট।

ডা. শাহজাদা সেলিম : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

selimshahjada@gmail.com

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com