বুধবার  ৮ই জুলাই, ২০২০ ইং  |  ২৪শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  |  ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

করোনার পরবর্তি বিশ্ব কোন পথে যাচ্ছে

জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল কিছুদিন পূর্বে বলিয়াছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে এই পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সবচাইতে বড়ো সংকটের মধ্যে পড়িয়াছে। বিশ্বের অধিকাংশ চিন্তাশীল মানুষ উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন যে, ১৯৪৫ সালের মে মাসের পূর্বের ও পরবর্তী সময়ের বিশ্ব যেইভাবে আলাদা হইয়া গিয়াছিল, কোভিড-১৯-এর কারণেও আমরা নূতন এক বিশ্বে পা রাখিতে যাইতেছি। অনেকে বরং আরো একধাপ আগাইয়া বলিতেছেন, করোনা ভাইরাস মহাযুদ্ধের চাইতেও অধিক মাত্রায় চেনাজানা বিশ্বকে পালটাইয়া দিতে পারে। এই অর্থে করোনা হইল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সবচাইতে বড়ো ‘রাজনৈতিক ঘটনা’। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর-পরবর্তী পৃথিবীতে পূর্বের মতো অনেক কিছু থাকিবে না। পরিবর্তনটা হইতে যাইতেছে অস্বাভাবিকভাবে ভিন্ন ও মৌলিক। নূতন অনেক কিছুর জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে মানবজাতিকে। ইহা এক অদ্ভুত অকস্মাত্ ট্রান্সফরমেশন! এই পরিবর্তনের আভাস ইতিমধ্যেই পড়িতে শুরু করিয়াছে।

এই বিশ্ব হইয়া উঠিতেছে ভার্চুয়াল। এবং ভার্চুয়াল হইতে যাহা যাহা প্রয়োজন, তাহার অনেকখানি প্ল্যাটফরম ইতিমধ্যে প্রস্তুত ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই মুহূর্তে শিক্ষা, বিপণন, বিনোদন বহুলাংশে হইয়া পড়িতেছে অনলাইনভিত্তিক। এমনকি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জৌলুসময় অনুষ্ঠানগুলি হইতে যাইতেছে অনলাইনে। বড়ো বড়ো হলরুমে বসিয়া, লালগালিচা কার্পেটে হাঁটিয়া এবং বিশ্বখ্যাত তারকাদের সহিত সম্মুখসাক্ষাতের সুযোগ না থাকিলে কীসের উত্সব? এমনটাই মনে এতকাল করিতেন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র উত্সবগুলির আয়োজকগণ; কিন্তু করোনা তাহাদের ভাবনাজগতে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়াছে। ৭৩ বত্সরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কান উত্সব হইতে যাইতেছে অনলাইনে। কান, নিউ ইয়র্ক, টরেন্টো, ভেনিসসহ বিশ্বের ২০টির অধিক চলচ্চিত্র উত্সবের সমন্বয়ে ইউটিউবে আয়োজন করা হইতেছে ১০ দিনব্যাপী চলচ্চিত্র উত্সবের। ইউটিউবে নির্বাচিত এই ছবিগুলি দেখা যাইবে বিনা মূল্যেই। এতদিন ধরিয়া বিশ্বের অনেক বড়ো বড়ো ফিল্ম অনুরাগী চলচ্চিত্রের শক্তির কথা বলিয়া আসিয়াছেন; কিন্তু চলচ্চিত্র কাঁটাতারের বেড়ার বিভাজন ডিঙাইয়া মানুষকে ‘এক’ করিতে পারে নাই কেহ। করোনা তাহা পারিয়াছে।

ইহার পাশাপাশি বলিতে হয়, যখনই বিদায় লউক, করোনা বিশ্বায়ন ধারণাকে নূতন এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলিয়া যাইবে। করোনা দেখাইয়া দিতেছে এতদিনকার এই বিশ্বব্যবস্থা তথা বিশ্বায়ন টেকসই নহে। করোনা বিশ্বায়নের অন্ধকার অংশে আলো ফেলিয়া দেখাইয়া দিতেছে কোথায় রহিয়াছে থকথকে সব ক্ষত ও ত্রুটি। ইহার সহিত নূতন নূতন সম্ভাবনার জায়গাটাও স্পষ্ট করিতেছে করোনা। উত্পাদন ও বিপণনের ব্যাপকভিত্তিক এক অনলাইন যুগে ঢুকিতেছে এই বিশ্ব। দোকানদারদের নিকট হইতে ‘বাজার’ চলিয়া যাইবে ‘ই-কমার্স’-এর দুনিয়ায়। ঘরে ‘কাজ’ এবং অনলাইনে ‘বিক্রিয়’-এর শিক্ষায় দীক্ষা লইতে হইতে পারে বিপুল শ্রমশক্তিকে। ইহার সহিত চিরায়ত ধাঁচের বিশাল আকৃতির কাঠামোগত ‘অফিস’ ধারণাটিও হুমকির মুখে পড়িতে পারে। বিস্ময়করভাবে ‘ডিমান্ড সাইড’ যে ‘সাপ্লাই সাইড’কে পালটাইবে তাহাই নহে, উলটাটাও হইতে পারে। অর্থাত্ সাপ্লাই সাইড নিয়ন্ত্রণ করিবে ডিমান্ড সাইডকে। সার্বিকভাবে এক ট্রান্সজিকশন পিরিয়ডের মধ্যে চলিতেছি আমরা। ইহা আমাদের কোথায় লইয়া যাইবে, তাহা এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নহে। নিজেদের মানাইয়া লওয়াটাই এখন সবচাইতে বড়ো চ্যালেঞ্জ।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com