রবিবার  ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং  |  ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ২২শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

ঈদ আনন্দ যাত্রায় তীব্র জন দুর্ভোগ

দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই ঈদ আনন্দ যাত্রা শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষ। ভাঙাচোরা সড়ক, দুর্বল রেললাইন এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ যথাসময়ে ছাড়ছে না।

ভাঙাচোরা সড়কপথে যানজট ও ধীরগতির কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাসের সিডিউল বিপর্যয় ও বাড়তি ভাড়া নেয়ার ভোগান্তিও।

নির্ধারিত টিকিটের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি যাত্রী ট্রেনে চেপে বসছেন। ফলে নড়বড়ে রেলপথে পুরনো ইঞ্জিন অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই বগি নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে ফেরি ও লঞ্চ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।
ফলে তিন পথেই মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ছুটে চলেছে নাড়ির টানে। বৃহস্পতিবার শেষ অফিস শেষে বাড়ির পথে বেরিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।

দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে খোদ ঢাকা শহরেই তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়েন যাত্রীরা। ঢাকায় ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই দুর্ভোগ সঙ্গী হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, ঈদযাত্রায় রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠছে। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট নিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো বৃহস্পতিবার রাজধানী ছেড়েছেন যাত্রীরা।

নির্ধারিত টিকিটধারীর চেয়ে ৩-৪ গুণ যাত্রী ট্রেনে ভ্রমণ করছেন। কোনো কোনো ট্রেন দেরিতে আসছে, দেরিতে ছাড়ছে। বৃহস্পতিবার ১৩টি ট্রেন ৩০ মিনিট থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করেছে।

শত ভোগান্তির মধ্যেও সাধারণ যাত্রীদের চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আনন্দের ছাপ। বৃষ্টির মধ্যেও ট্রেনের ছাদে উঠছিল লোকজন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাফ বক্তব্য, ঈদের সময় কিছু ট্রেন বিলম্বে চলাচল করবে, করছেও।

এটি শুধু অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে হচ্ছে। ৩-৪ গুণ যাত্রী নিয়ে নির্ধারিত গতিতে কোনোক্রমেই ট্রেন চালানো সম্ভব না। সিডিউল বিপর্যয় নয়, বিলম্বে চলছে ট্রেন।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিলাম। স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড়। প্রতিটি প্লাটফর্মেই যাত্রীতে ঠাসা। এক একটি ট্রেন আসতেই লোকজন হুড়াহুড়ি করে ট্রেন উঠছে।

পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ছেড়ে আসা প্রায় প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেন কমলাপুর ঢোকার আগেই বিমানবন্দর, জয়দেবপুর কিংবা আশপাশের স্টেশনগুলো থেকে যাত্রীরা ট্রেনে উঠে সিট তথা পুরো কোচ দখল করে বসে পড়ছে।

তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ অনৈতিক। ফলে যারা কমলাপুর স্টেশনে টিকিট কেটে স্টেশনে বসে আছেন, তাদের অনেকেই ট্রেনে উঠতে পারছে না। আমরা প্রশাসন দিয়ে আগে কোচ দখলে নেয়া লোকজনকে নামিয়ে দিয়েছি।

ইতিমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কেউ যেন স্টেশনে পৌঁছার আগেই ট্রেনে না উঠতে পারে। যে কোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ঈদের সময় নানা কারণে বিশেষ করে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই নির্ধারিত গতি নিয়ে ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে অনেক ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। তাছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ দিয়ে ১০-১৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ঘরমুখো যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই অনেক যাত্রী স্টেশনে আসছেন। এদিকে কমলাপুর স্টেশন কাউন্টারের সামনে স্টেশনে প্রবেশপথ এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃষ্ট এলেই পিলার ঘেঁষে পানি পড়তে থাকে, এতে পুরো এলাকায় পানি ছড়িয়ে পড়ে। এতে পিচ্ছিল হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। কমলাপুর স্টেশনে ৭টি প্লাটফর্ম। এর প্রতিটিতেই যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

কোনো ট্রেন ৩০ মিনিট আবার কোনো ট্রেন ৪ ঘণ্টা বিলম্বে কমলাপুরে আসছিল। বিলম্বে আসা ট্রেনের টিকিটধারী যাত্রীসহ টিকিটবিহীন লোকজনের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এক একটি ট্রেন স্টেশনে প্রবেশ করতেই ট্রেনে ওঠার যুদ্ধ শুরু হয়।

নীলসাগর এক্সপ্রেসের যাত্রী শাহজাহান মোল্লা জানান, স্ত্রী-সন্তান আর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষায় আছেন। চার ঘণ্টা পর ট্রেনটি এসেছে। এটি নাকি আরও প্রায় ১ ঘণ্টা বিলম্বে স্টেশন ছেড়ে যাবে। একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী শিউলী আক্তার জানান, স্টেশনেও এডিস মশার আনাগোনা রয়েছে।

সন্তানদের বারবার স্প্রে দিচ্ছেন। স্টেশনে এডিস মশা নিধনে কোনো স্প্রে করা হচ্ছে না। আতঙ্কের মধ্যেই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো যাত্রী বলেছেন, বিভিন্ন ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় হলেও রেলপথ সবচেয়ে নিরাপদ।

৩-৪ ঘণ্টা বিলম্বে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারলেও তারা খুশি। কমলাপুর রেলস্টেশন ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ঈদ উপলক্ষে যেসব ট্রেন বিলম্বে চলছে, সেগুলোকে আমরা সিডিউল বিপর্যয় বলতে চাচ্ছি না।

ট্রেন বিলম্বে চলছে এটা ঠিক, তবে শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়েই তা হচ্ছে। এক একটি ট্রেনে নির্ধারিত যাত্রীর চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি উঠছে। একই রকম অবস্থা কমলাপুর স্টেশনে আসা ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রেও। পশ্চিমাঞ্চলে চলা ৭টি আন্তঃনগর ট্রেন দেড় থেকে ৫ ঘণ্টা বিলম্বে কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে ১৩টি ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে।

সড়কপথ : এদিকে সড়কপথে যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। ভোগান্তির কথা জানিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার একটু আগেভাগে বেরিয়ে ছিলাম সন্ধ্যার মধ্যে মাদারীপুরে নিজ বাড়িতে পৌঁছাব বলে।

বেলা আড়াইটায় বনানী থেকে গাড়ি উঠে গুলিস্তান পৌঁছেছি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লেগেছে চার ঘণ্টা। এরপর গুলিস্তান থেকে মাওয়ার গাড়িগুলোতে ভাড়া হাঁকছে দু’শ টাকা। অথচ অন্যান্য সময়ে ওই ভাড়া ছিল ৭০ টাকা। তিনি বলেন, পথে পথে বৃষ্টি ও যানজটের ভোগান্তি সহ্য করার পর বাড়তি ভাড়াও গুনতে হচ্ছে। এ যেন দেখার কেউ নেই। একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন যাত্রী।

সরেজমিন দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবসে বিকাল ৩টার পর থেকেই বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়ির উদ্দেশে বের হন। ওই সময়ে ছিল প্রচণ্ড বৃষ্টি। রাস্তায় পানি জমে গেছে। বৃষ্টি ও পানি মাড়িয়ে গাড়িতে উঠবেন, এমন উপায় ছিল না।

সচিবালয়ের আশপাশের সব কটি সড়কেই ছিল তীব্র যানজট। রাস্তায় গণপরিবহন ছিল কম। ওইসব গাড়িতে আগ থেকেই যাত্রী ভরপুর থাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গাড়িতে উঠবেন এমন সুযোগও ছিল না। ওই সময়ে জিপিওর সামনে থেকে মাওয়াগামী কয়েকটি বাস দু’শ টাকা ভাড়ায় যাত্রী তুলছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বাড়তি ভাড়া নেয়া হলেও কেউ প্রতিবাদ করেনি।

যাত্রীরা অভিযোগ করেন, বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়েছে গাবতলী থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি বাসেও। আগাম টিকিট বিক্রি করেনি এমন বাসগুলোতে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। গাবতলী থেকে পাটুরিয়াগামী বাস সেলফি ও পদ্মা লাইন নামের পরিবহনগুলোতে ‘ঈদ মোবারক’ লেখা নতুন টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

জনপ্রতি ভাড়া নেয়া হচ্ছে একশ’ টাকা। অথচ আগে এ পথে ৮০ টাকা ভাড়া নেয়া হতো বলে জানান যাত্রীরা। রাজবাড়ীর যাত্রী মো. আবদুস সালাম বলেন, সবসময় ৭০-৮০ টাকা ভাড়া নেয়া হতো। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি ভাড়া নিলেও কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেলফি পরিবহনের শ্রমিকরা জানান, মালিক সমিতির নির্দেশে এ ভাড়া নেয়া হচ্ছে।

গাবতলী বাস টার্মিনালে বিভিন্ন কোম্পানির নামে ‘বিশেষ বাস’ ছাড়তে দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাটোরের যাত্রী রফিক হোসেন জানান, নাটোরের ভাড়া ৬৫০ টাকা আদায় করা হয়েছে। সাধারণত ৪৫০-৫০০ টাকা ভাড়া নিত। সুপার স্টার সার্ভিস নামের বাসে রংপুরের ভাড়া নেয়া হয় ৭০০ টাকা। যাত্রীরা জানান, সাধারণ সময়ে ওই পথের ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা ছিল।

জানা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, পাবনা নাটোর, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের বাসগুলো যথাসময়ে ঢাকা ছেড়ে গেলেও বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পেছাতে থাকে সময়সূচি। অনেক কোম্পানির বাস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দু-তিন ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে।

উত্তরবঙ্গগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কাউন্টার কর্মী রবিউল ইসলাম জানান, সকাল থেকে গাড়িগুলো যথাসময়ে ছাড়লেও দুপুরের পর সাভার বাইপাইল এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে সড়কের বিভিন্ন স্থানে গরু বোঝাই ট্রাক- এটাই যানজটের কারণ।

নৌপথ: এদিকে বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই প্রিয়জনের টানে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। বৃহস্পতিবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে (ঢাকা নদীবন্দর) যাত্রীদের বেশ ভিড় দেখা গেছে। বৃষ্টির কারণে লঞ্চের ছাদে উঠতে পারেননি যাত্রীরা। তবে ডেক ও কেবিনগুলো ছিল পরিপূর্ণ।

আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এ চাপ অনেক বেশি হতো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক আবু জাফর হাওলাদার জানান, গতকাল শেষ কর্মদিবসে অফিসের পর অনেকেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেছেন।

এ কারণে সন্ধ্যার পর টার্মিনালে ভিড় বাড়ে। তবে কোনো লঞ্চই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘাট ছাড়েনি। ঢাকা নদীবন্দর থেকে বরিশাল, টরকী, আমতলী, বরগুনা, চাঁদপুর, ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৪৩ গন্তব্যে আগের দিন ৮০টি লঞ্চ ছেড়ে গেলেও আজ (বৃহস্পতিবার) এ সংখ্যা বেড়ে ১০০টির মতো হতে পারে।

প্রবল স্রোত ও বাতাসের কারণে পদ্মায় ফেরি পারাপার বিঘ্নিত হওয়ার চাপও এসে পড়ে সদরঘাটে। অনেকে সড়কপথের পরিবর্তে নৌপথে পাড়ি জমাতে সদরঘাটে আসেন।

বরগুনাগামী যাত্রী ইউসুফ মিয়া জানান, প্রথমে বাসে তিনি গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি পারাপার নিয়ে সংকট দেখা দেয়ার কথা জানতে পেরে লঞ্চে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মুষলধারে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ সদরঘাটে আসা যাত্রী আবু বকর জানান, লঞ্চে উঠতে যতটা কষ্ট হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন, সদরঘাটে এসে দেখেন অবস্থা ভিন্ন। মোটামুটি ভিড় থাকলেও সহজেই লঞ্চে ওঠা গেছে। তবে ঝড়-বৃষ্টির কারণে আতঙ্কে আছেন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, কেবিন বুকিং দেয়া ছিল। তাই না এসে উপায় ছিল না।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com