রবিবার  ২৪শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং  |  ১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  |  ১০ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

ইরান কি সত্যি আল-কায়েদার নতুন ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে?

‘ইরান এখন আল-কায়েদার নতুন ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে’, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এমন এক উক্তির পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তীব্র সমালোচনা করেছেন। এরপর থেকে ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে বড় খবর হয়ে ওঠেছে। প্রশ্ন ওঠছে ইরান কি সত্যি আল-কায়েদার নতুন ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে?

‘আফগানিস্তানে আল-কায়েদা যেমন পাহাড়-পর্বতে লুকিয়ে থাকতো, এখন আর সেরকম নয়। এখন আল-কায়েদা কাজ করছে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর দেওয়া সুরক্ষার পুরু খোলসের ভেতর থেকে’, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন মাইক পম্পেও। তবে তিনি তাঁর এমন অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেননি। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ একে ‘যুদ্ধোন্মাদসুলভ মিথ্যে’ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে মনে করেন যে ইরানের মতো একটি শিয়া মুসলিম শক্তি এবং আল-কায়েদার পরস্পরের তিক্ত শত্রু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না – কারণ এই সুন্নি চরমপন্থী গোষ্ঠীটি শিয়াদের ধর্মদ্রোহী বলে মনে করে। কিন্তু মাইক পম্পেও বলছেন, যারা এটা মনে করেন তারা ভুল করছেন।

গত নভেম্বর মাসে খবর বের হয় যে আল-কায়েদার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবদুল্লাহ আহমেদ আবদুল্লাহ – যিনি আবু মুহাম্মদ আল-মাসরি নামেও পরিচিত ছিলেন – তাকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে তেহরানের রাস্তায় গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি এজেন্টরা। ইরান এ রিপোর্টের সত্যতা অস্বীকার করেছিল। ওয়াশিংটনে মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে পম্পেও বলেন, তিনি এই প্রথম বারের মতো নিশ্চিত করছেন যে আল-মাসরি ৭ আগস্ট তারিখেই নিহত হয়েছেন। তবে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। তিনি বলেন, ইরানের ভেতরে মাসরির উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে আল-কায়েদা একটি নতুন ঘাঁটি পেয়েছে। তার তা হচ্ছে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ এক টুইট বার্তায় বলেন, কিউবা থেকে শুরু করে ইরান আর আল-কায়েদা বিষয়ে কাল্পনিক দাবি তোলার পর পম্পেও তার বিপর্যয়কর কেরিয়ার দুঃখজনকভাবে শেষ করতে যাচ্ছেন আরো কিছু যুদ্ধোন্মাদসুলভ মিথ্যা দিয়ে। জারিফ বলেন, ‘কেউ বোকা নয়। ৯/১১-এর সব সন্ত্রাসীই পম্পেওর প্রিয় মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্য (দেশগুলো) থেকে এসেছিল। কেউ ইরানের ছিল না। জাভাদ জারিফ তার বার্তায় পম্পেওকে সম্বোধন করেন মিস্টার ‘আমরা-মিথ্যা-বলি-প্রতারণা-করি-চুরি-করি’ বলে।

ইরানের সাথে কি আসলেই আল-কায়েদার সম্পর্ক আছে?

মাইক পম্পেও ২০১৫ সাল থেকেই বলে আসছেন যে আল-কায়েদার সদস্যদের সাথে যোগাযোগসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডের জন্য গোষ্ঠীটির নেতাদেরকে ‘অবাধ সুযোগ’ দিচ্ছে ইরান। পম্পেওর কথায়, আগে একটা সময় ছিল যখন আল-কায়েদার আক্রমণের অনুমতি দেওয়া, প্রচারাভিযান চালানো এবং তহবিল সংগ্রহ – এসব কাজ পরিচালনা করা হতো আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে। আর এখন এগুলো হচ্ছে ইরান থেকে। ইরানের ঘাঁটি গাড়ার কারণে ‘ওসামা বিন লাদেনের এই দুষ্ট সৃষ্টি এখন শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করার মুখে।’ পম্পেও বলছেন, ‘ইরান-আলকায়েদা অক্ষশক্তি আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তার প্রতি এক গভীর হুমকি এবং আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরানে অবস্থান করছে বলে মনে করা হয় এমন দুজন আল-কায়েদার নেতাকে ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ বলে চিহ্নিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তারা হলেন, মোহাম্মদ আব্বাতাই বলে পরিচিত আবদুল রহমান আল-মাগরেবি এবং সুলতান ইউসেফ হাসান আল-আরিফ। তাদের ব্যাপারে তথ্য দেওয়ার জন্য ৭০ লাখ ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

আল-কায়েদার কিছু জঙ্গি এবং ওসামা বিন-লাদেনের পরিবারের কিছু সদস্য ২০০১ আফগানিস্তানে সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর ইরানে পালিয়ে যায়। তবে ইরানের কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে তারা অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়েছিল এবং তাদের গ্রেপ্তার করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

গত বছর আল-মাসরি নিহত হবার খবর বেরুনোর পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছিল যে তাদের মাটিতে কোনো ‘আল-কায়েদার সন্ত্রাসী’ নেই। মঙ্গলবার একজন ইরানি মুখপাত্র রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বলেন, ইরান অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ তার মহযোগী গোষ্ঠীগুলোর শিকার এবং ইরানের আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্পষ্ট ইতিহাস রয়েছে।

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে ৯/১১-র আগে বা পরে কখনোই আল-কায়েদার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল না। তাদের মধ্যে বর্তমান সহযোগিতার দাবিকে সংশয়ের চোখেই দেখতে হবে।

আল-মাসরি কিভাবে নিহত হয়েছিলেন?

গত বছর নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করে যে, গত বছর ৭ আগস্ট তেহরানের রাস্তায় মোটরবাইক আরোহী দু’জন ঘাতক আল-মাসরি এবং তার মেয়েকে গুলি করে হত্যা করে। আল-কায়েদার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবু মুহাম্মদ আল মাসরি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে ১৯৯৮ সালে আফ্রিকায় আমেরিকান কিছু দূতাবাসে মারাত্মক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।

নিউইয়র্ক টাইমস বলেছিল, ইরান প্রথম এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। ইরানি ও লেবানিজ মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়, ৭ আগস্ট গুলিবর্ষণে নিহতরা লেবানিজ ইতিহাসের একজন অধ্যাপক ও তার মেয়ে। পরে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ওই ঘটনার কথা অস্বীকার করে।

ইসরায়েলের একটি টিভি চ্যানেল পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্ট করে যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ স্বার্থে চালানো এক অপারেশনে আবদুল্লাহ-র মৃত্যু হয়েছে কারণ তিনি ইসরায়েলি এবং সারা বিশ্বের ইহুদিদের বিরুদ্ধে আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন। ২০০৩ সাল থেকে তিনি ইরানে প্রথমে গৃহবন্দী অবস্থায় এবং পরে মুক্তভাবে বাস করছিলেন বলে আমেরিকান গোয়েন্দা সূত্র উদ্ধৃত করে জানানো হয়।

পম্পেও ঠিক এই সময় এ কথা বলছেন কেন?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এই ঘোষণা ঠিক এ সময়টায় এলো কেন – তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কিছু বিশ্লেষক। ২০১৫ সালে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ৬টি শক্তিধর দেশের সাথে যে চুক্তি করেছিল – ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর তিনি সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে আসেন এবং ইরানের ওপর আরো কঠোর কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এখন ট্রাম্পের বিদায় এবং জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হবার পর তিনি হয়তো ইরানের ব্যাপরে নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, জো বাইডেনের জন্য ইরানের সাথে আবার যোগাযোগ শুরু করা এবং ২০১৫ -র চুক্তিতে আবার যোগ দেওয়া যেন কঠিন হয়ে পড়ে – সে চেষ্টাই পম্পেও করছেন বলে মনে হচ্ছে।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com