শিরোনাম
রবিবার  ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং  |  ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  |  ১৯শে রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

আমার ম্যারাডোনা, আমাদের ম্যারাডোনা

লিওনেল মেসিকে নয়। তেভেজ কিংবা ভেরনদের কাউকেও নয়। খুঁজছিলাম তাঁকে, যিনি ফুটবলের মধ্যে জীবনের সব রং যোগ করেছেন। যাঁর উত্থানে-পতনে, জীবনে-জীবনযুদ্ধে, সৃষ্টিতে-ভাঙনে শুধুই ফুটবল। এবং যিনি দেশ-ভূগোল-মানচিত্রের ব্যবধান মুছে দিয়ে আমাদের কাছে পাশের বাড়ির ছেলের মতো আপন। পৃথিবীতে আবির্ভূত শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা কি না জানি না, কিন্তু পৃথিবীতে আবির্ভূত সবচেয়ে বর্ণিল চরিত্র। এত লোককে এর আগে একসঙ্গে কেউ কাঁদাতে পারেনি। এত মানুষকে এতটা পাগলও এর আগে কেউ করেনি।

কোথায় তিনি? নেই তো। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আর্জেন্টিনা দলের প্র্যাকটিসে ঢুকে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ম্যারাডোনা তাহলে ফাঁকি দিয়ে আগেই চলে গেছেন। জোহানেসবার্গ থেকে প্রিটোরিয়ার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। স্থানীয় এক বাঙালি ব্যবসায়ীর দারুণ গাড়ি এবং তার চেয়ে দারুণ গাড়িচালনার দক্ষতায় পৌঁছে গেছি নির্ধারিত সময়ের আগেই। তার পর থেকেই ক্ষণ গণনা। কখন? কখন? ম্যারাডোনাকে দেখা হবে। সেই নায়কটি, যাঁকে দেখে বড় হওয়া, যাঁর কারণে আজ বাংলাদেশেও ফুটবল আর বিশ্বকাপের এই উš§াদনা। পাশে বসা এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিককে ‘কেন ম্যারাডোনা নেই’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল মোটাসোটা আকৃতির একজনের দিকে। না, চেহারার জন্য নয়, পেছনের পা দিয়ে বল কন্ট্রোলের একটা কায়দা দেখে। ম্যারাডোনা নয় তো! এবং ম্যারাডোনাই। প্র্যাকটিসে এখন তিনি পুরাদস্তুর ট্র্যাকস্যুট পরে থাকেন। ফলে কোচিং স্টাফদের থেকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। কিন্তু ওই যে পায়ের ছোট্ট কারিশমা, তাতেই তিনি অনন্য। মানুষ তিনি, আমাদের মতোই, কিন্তু চিরটা কাল তাঁকে মানুষের চেয়ে বেশি মূল্যেই ভক্তি করে এসেছি। স্বপ্নের সেই মানুষটি কিংবা অতিমানুষটি হাতছোঁয়া দূরত্বে।

এই ২০১০ সালের ১০ জুনের শেষ বিকেলে প্রিটোরিয়া ইউনিভার্সিটির রাগবি গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে থেকেও যেন চলে গেলাম ১৯৮২ সালের এক মধ্যরাতে। স্পেনের বিশ্বকাপ। দূরদর্শনে দেখছিলাম বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। বিশ্বকাপ সেটাও ঠিক তখন ভালো করে জানি না। শুধু জেনেছিলাম, খুব ভালো ফুটবল খেলা হবেÑআমরা বিকেলে যেমন মাঠে খেলি, তার চেয়ে অনেক সুন্দর। সেই লোভে টিভির সামনে বসে খেয়াল করলাম, খোঁচা খোঁচা দাড়ির, মোটাসোটা আকৃতির একজন খেলোয়াড় বল পেলেই নানা কাণ্ড করে ফেলছে, কাটিয়ে ফেলছে যাকে-তাকে। তখন আমাদের কাছে ফুটবল মানেই কে কত কাটাতে পারে। কিন্তু কাটালেও এগোতে পারছে না; কেউ না কেউ তাকে ফাউল করে ফেলে দিচ্ছে। আর খেলোয়াড়টি ফাউলের শিকার হয়ে অবাক চোখে সবার দিকে তাকাচ্ছে, যেন পৃথিবীর এই নিষ্ঠুরতায় সে যারপরনাই বিস্মিত। বেলজিয়ামের সঙ্গে সেই ম্যাচটায় আর্জেন্টিনা জেতেনি, কিন্তু ম্যারাডোনা কিশোরমনটা জিতে নিয়েছিলেন। বুঝে গিয়েছিলাম, এ-ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড়। চার বছর পর ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচে খুনে ছন্দে তিনি ইংলিশ খেলোয়াড়দের কাটিয়েছেন। আমরাও সেই ছন্দে নেচেছি। তিনি গোল করেছেন; আমাদের মনে হয়েছে, আমরাও। তিনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন; আমরা মনে করেছি, আমরাও।

একা একা তিনি যাচ্ছেন কোথায়? একটু খোঁড়াচ্ছেনই বা কেন? আর্জেন্টিনার ওলে পত্রিকার সাংবাদিক হোর্হে ব্যাখ্যা করলেন, ‘ওর বাঁ পায়ে চিরকালের সমস্যা। আঘাতে…আঘাতে…।’ সব বল একীভূত করলেন, কোনো একটা প্র্যাকটিসের প্রয়োজনে; এবং দেখলাম, আমি একা নই, সব টিভি ক্যামেরা, সব চোখ ম্যারাডোনার দিকেই, যদিও বাকি মাঠে মেসিরা তখনো জ্বলছেন। তখনো তেভেজ-ভেরনরা নানা কায়দা দেখাচ্ছেন। আমি তো প্রথম দেখছি, কিন্তু এই যে তিন শতাধিক আর্জেন্টাইন সাংবাদিকের ব্রিগেড, তারা তো রোজই দেখে, ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে দেখে আসছে; তবু তাদের দেখার শখ মেটে না! হোর্হে বললেন, আসলে মেটে না। আমরা ওর সমালোচনা করি, ও আমাদের সঙ্গে যা-তা আচরণ করে, কিন্তু তার পরও আমরা জানি, সে-ই এক নম্বর। নুমেরো উনো।

প্র্যাকটিসের সেই অংশে তিনি আর ঠিক কোচ নন, যেন সতীর্থ একজন। আর্জেন্টাইনরা তখন আমাদের ‘চোর চোর’ খেলার মতো একটা খেলা খেলছিল। যিনি বল মিস করবেন, তাঁকে বলের পেছনে ছুটতে হবে। তাঁকে সবাই মিলে মারবেনও। তো একবার ম্যারাডোনা মারও খেলেন। বয়স আঘাত হানছে ক্রমে, অনিয়ন্ত্রিত আর অনিয়মে ভরা জীবনের ফলে শরীর আজ একেবারেই অফুটবলারসুলভ। ইদানীং দাড়ি রাখায় চেহারায় সেই বিপ্লবী তারুণ্যের রূপটা আর নেই। যে তাঁকে কোনোদিন খেলতে দেখেনি, তার কাছে মনে হবে, মধ্যবয়সী একজন সাধারণ মানুষ। আর দশজনের মতো বয়সে বুড়ো হতে চলেছেন, মেদ-ভুঁড়িও বেড়ে গেছে সাধারণ নিয়মে। কিন্তু দৃষ্টির সামনের এই ম্যারাডোনার পেছনে যে অশরীরে উপস্থিত আমাদের ম্যারাডোনা সেই তারুণ্য, সেই তেজ, সেই জাদুকরী ক্ষমতা, সেই আবেগ নিয়ে। মনে হলো, এ মানুষটি জীবনে আমাকে কতবার কাঁদিয়েছেন, আবার কতবার অপার্থিব আনন্দে ভাসিয়েছেন। কৈশোরের সুখ-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় কী অনিবার্য উপস্থিতি ছিল তাঁর। সত্যিই কাঁপছিলাম তখন। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল চোখ। সাংবাদিকতার সূত্রে এই জীবনে বহু তারকা দেখা হয়েছে। বহু ঘটনা। বহু অভিজ্ঞতা। কিন্তু কোনোদিন মনে হয়নি, এ মুহূর্তটার ছবি তুলে রাখি, এ সময়টার কথা সবাইকে বলতে হবে। আজ মনে হলো।

মনে হলো, ঠিক বোধহয় আর বাস্তবে নেই। আনন্দ, উল্লাস, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, তৃপ্তি, প্রাপ্তি মিলিয়ে কেমন যেন একটা ঘোর। বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিলাম। আর সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, অবিরত পূজা করতে থাকলে পূজারি যেমন একসময় দেবতার দেখা পায়, তেমনি সৌভাগ্যবান আমি।
আমাদের দেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সূত্রে অবিশ্বাস্য এবং অমোচনীয় বিভক্তি। এখানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বুঝি না, কোচ ম্যারাডোনাকে চিনি না। চিনি সেই তারুণ্যের ম্যারাডোনাকে, যে কাঁদায়-হাসায় আর জানায়, আমাকে দেখো। আমি তোমাদের জন্য ফুটবলের ভেতরে ভরে স্বর্গের আনন্দ বয়ে নিয়ে এসেছি।
এই ম্যারাডোনাকে ভালো না বাসলে পাপ হয়।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com