বুধবার  ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং  |  ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ  |  ১৮ই মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

আমাজনে আগুনের লেলিহান শিখা! প্রকৃতি বাঁচান

আমাজন জঙ্গলকে বলা হয় বিশ্বের ফুসফুস। সেই আমাজন এখন স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ আগুনে পুড়িতেছে। বিশ্ব পরিবেশের ওপর ইহার প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে বলিয়া অনেকে আমাজন রক্ষায় সোচ্চার হইয়াছেন। আমাজন ইস্যুতে গত শনিবার হইতে শুরু হওয়া ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনও উত্তপ্ত হইতে শুরু করিয়াছে। ইতোমধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়াছেন, যেহেতু আগুনের উত্পত্তিস্থল ব্রাজিল, তাই ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট আগুন নিভাইবার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা হইবে। ফলে বিশ্বনেতাদের চাপের মুখে অবশেষে সেখানে সেনাবাহিনী পাঠাইয়াছে ব্রাজিল। বলিভিয়া বিমান হইতে পানি ঢালিতেছে। গত এক দশকে এমন দাবানল আর সৃষ্টি হয় নাই। ব্রাজিলে আমাজনের হাজার হাজার স্থানে আগুন জ্বলিতেছে। রোরাইমা, একার, রনডোনিয়া প্রভৃতি এলাকার অবস্থা শোচনীয়। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়াইয়া পড়িতেছে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত। ২০১০ সালের পর হইতে সবচাইতে বেশি ধোঁয়া নির্গত হইতেছে। অর্থাত্ সার্বিক পরিস্থিতি বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক।

আমাজন জঙ্গল দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীবিধৌত অঞ্চলে অবস্থিত এক বিশাল বনভূমি। ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত এই অরণ্যের প্রায় ৫৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকাটি মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। এইখানে শুষ্ক মৌসুমে জুলাই হইতে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায়শই দাবানলের সৃষ্টি হয়। তবে সম্প্রতি ইহার মাত্রা বাড়িয়াছে। গবেষণায় বলা হইতেছে, গত বত্সরের তুলনায় এই বত্সর আগুন লাগিবার ঘটনা ৮৫ ভাগ বাড়িয়াছে। হিসাব অনুযায়ী এই বত্সরের প্রথম আট মাসে ব্রাজিলের জঙ্গলে ৭৫ হাজারের বেশি দাবানল হইয়াছে। বাজ পড়িলে বা প্রাকৃতিক অন্যান্য কারণে যেমন দাবানল তৈরি হয়, তেমনি কৃষক ও কাঠুরেদের ফসল উত্পাদন বা পশু চরানোর জন্য জমি পরিষ্কার করিবার অজুহাতেও অনেক সময় জঙ্গলে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হইয়া থাকে। ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বলসোনারো প্রায়শ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো পরিবেশবিরোধী কথাবার্তা বলিয়া থাকেন। তাই অনেকের অভিমত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আমাজনে আগুন লাগানো হইয়া থাকিতে পারে। অবশ্য প্রেসিডেন্ট ইহার জন্য দোষ দিতেছেন এনজিওদের উপর, যাহারা কৃষক ও কাঠুরিয়াদের উসকাইয়া দিতেছে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। আগুন লাগিবার প্রকৃত কারণ যাহাই হউক, ইহার ক্ষতি অপূরণীয়। বিশেষ করিয়া, যে ৯টি দেশ জুড়িয়া এই অরণ্য বিস্তৃত সেইসব দেশ সরাসরি কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির শিকার হইবে। পৃথিবী জুড়িয়া যে রেইনফরেস্ট, তাহার অর্ধেকটাই এই অরণ্য নিজেই। এখানে প্রায় ১৬ হাজার প্রজাতির প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন বৃক্ষ রহিয়াছে। সুতরাং আমাজনের এই ভয়াবহ দাবানলের আসল ক্ষতিটা যে সারা বিশ্ববাসীর তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

আমাজনের এই রেইন ফরেস্ট হইতে পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন আসে। এখানে ৪৫ লক্ষ প্রজাতির পোকামাকড় রহিয়াছে, যাহা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এই নদীতে ৩ হাজার প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী রহিয়াছে, যাহা আমাজনের তাত্পর্যকে নূতন করিয়া তুলিয়া ধরে আমাদের সম্মুখে। এখানে ৩০০-এর বেশি উপজাতি বসবাস করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পেনিসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেমস এলকক বিবিসিকে এই সাক্ষাত্কার দেওয়ায় পরিবেশবাদীরা নড়িয়াচড়িয়া বসেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করিয়া বলেন যে, আমাজন অরণ্য আগামী ৫০ বত্সরের মধ্যে বিলীন হইয়া যাইতে পারে। চলমান দাবানল তাহারই ইঙ্গিতবাহী কি না তাহা কে বলিতে পারে!

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com