বৃহস্পতিবার  ২৮শে মে, ২০২০ ইং  |  ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ  |  ৪ঠা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

অনিন্দ্য জসীম এর কাব্যের সৌরভঃ দুনিয়া মামুন।

অনিন্দ্য জসীম এর কাব্যের সৌরভঃ
দুনিয়া মামুন।

কবি অনিন্দ্য জসীম ১৯৭২ সালের মে মাসের প্রথম দিবসে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার বন্দসাংসা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
‘দুপুর ও ছায়ার জ্যামিতি’ কবির তৃতীয় কাব্যগ্রহন্থ। কাব্য, রসদ ও রসায়নের আলাদা মাত্রা দিয়েছেন কবি তার এই বইটিতে। কবির ভাবনায় প্রকৃতি ও প্রেমের বর্ণনা পাওয়া যায় বইটির শুরু থেকেই। লিখেছেন-
‘শিমুলের শুকনো পাপড়ি
হলুদ খামের ভেতর
গন্ধহীন শুয়ে আছে বহুকাল
প্রেমের ফসিল হয়ে।‌’
চেতনার নৈসর্গিক ভাবনা ফুটিয়েছেন কাব্যিকতায়। ঢেলে দিয়েছেন প্রেম, দ্রোহ আর জাগতিক সৌন্দর্যের উপমা এইভাবে
‘দিকহীন গোলাকার রহস্যে নৈসর্গিক চেতনায়
শূণ্যতার পাল উড়িয়ে উড়ে যাচ্ছি
যেখানে আমার সময়ে
দিন-রাত্রি নেই, জগৎ-সংসার নেই, নেই প্রেম
মায়ার বন্ধন।
আবার….
‘শরাব ঢালার শব্দময় ঝরনা
তোমার দুচোখে নেমে আসুক
নৈঃশব্দে।
কবির ইচ্ছের বর্ণনা যথার্থই সৌখিন করে বলেছেন..
আমার ইচ্ছেগুলো শিয়রে অপেক্ষমান
বিমূর্ত আপেল।

কাঁঠালচাঁপার গন্ধে আলোকিত হয়ে ওঠে
শূণ্যতার ভিতর-বাহির।

অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখেছেন নীরব প্রেম। কি ভাবে মানুষকে আন্দোলিত করে, কিভাবে মিইয়ে যায়, কিভাবে নাড়া দেয়। সেই ভাবনা বিনিময় করেছেন এইভাবে….
‘দূরে একচক্ষু হরিণের ডাক
কাছে আসতে আসতে ক্রমশ বিলীন
আমাদের মাঝখানে’

‘তড়ই বেড়ার ফাঁক গলে ঢুকে গেলে কার্তিকের চাঁদ
আমি তার বুকের জোছনার আল্পনা আঁকি
সমুদ্রের চোখ আঁকি’

‘আমি অনুবাদ করি জারুল তলায়
স্মৃতিকথার দোয়েলের যৌনকলা
শিস দিয়ে গান গায় আমার শৈশব’
প্রান্তিক মানুষের স্বভাবত জীবন-যাপন আর সৌন্দর্য নিয়ে কবি লিখেছেন…
‘উঠানে ছড়ানো বিরুই ধানের গায়ে
লেগে থাকা ধূলো আর চিটা জানে না
ধান ওড়ানো বাতাসের এলোমেলো মতিগতি
কৃষাণীর ঘর্মাক্ত পেশির ঘ্রাণ
কতটা ধরেছে প্রেম, শ্রমে ও ঘামে’

‘আদিম এক পাথরের সাথে কথা হয়
সব পাথরেই ক্ষত আছে, ব্যথা আছে
পাথরও কথা কয়’
এইসব অন্তরানুভূতির অসংখ্য কথা আর কল্পনার অনেক ছবি অঙ্কিত হয়েছে কবির কবিতার ভেতর। এ যেনো বাউল মনের উদাস দুপুর, এ যেনো ভাবুকের অনন্য প্রিয় সুর…
‘ভেতরে পুরনো ক্ষত
নড়ে ওঠে শিহরিত মৌনতায়
ব্যথা নেই, শুধু চিহ্নের প্রলেপ আঁকা
তবুও সময় ডাকে আয় আয়…
বয়স বেড়েছে, স্মৃতির সরণি ফাঁকা
মধ্যরাতে আমাকে জাগায় কে, একা!
যে পাখি রাত জাগে সে আমার
প্রেমিকার ডাকনাম’
আবার লিখেছেন…
‘তোমাকে খুঁজে পাই পাঁজরের ঘামে
শব্দের খেলায় খুলে গেলে বিশ্বস্ত জড়তা
আদিমতা জেগে ওঠে
ও বৃষ্টি জল দাও জল দাও
জলেতে মরণ জানি জলেতে জন্মবীজ
রোপন করেছে সব নৈঃশব্দ্য সংগীত’

‘শিমুল গাছের সাথে কথা বলে বলে
এই সব জেনে গেছে পাহাড়ি রাখাল’

আদিবাসী পল্লীর আদিমতা, রসায়ন ও তাদের ঐতিহ্য নিপূণভাবে প্রকাশ পেয়েছে কবিতার গহীনে। তিনি অবগাহন করেছেন আদি শিল্পের শরীরে। লিখেছেন…
‘হান্ডির অবশেষ নিঃশেষ হলে
যতিচিহ্নহীন জোছনার হলুদ গায়কি
বাড়ি ফেরার খোঁয়ারি চোখে মনে পড়ে
শিমুলের নামে কবুতর পোষা
গারোপাহাড়ের উর্বশী ছায়ায় কবিতার জলপান’

‘মৃত মাছের অপলক চোখে
ঘোলাটে অজস্র জাগতিক বোধ
নড়ে ওঠে পানপাত্রে’

‘হে গজারিবনের দোয়েল যতটা সম্ভব কাছে এসো
আমাক শোনাও পাতাঝরা কুয়াশার গান’
আবার হয়ত অভিমানের ছলে লিখেছেন…
‘কাল যদি না পাই সময়
কাল যদি না-ই থাকো পাশে
কাল যদি এই ঘাসে বসে যায় আর কেউ
বিকালের মতো বিকাল কাল যদি না আসে
কোনো এক সূর্যাস্তের মতো ডুবে যাব।

‘দূরে, জানালায় হাত নড়ে ওঠে কার
আমি কি ছায়ার জ্যামিতি
কারও ইশারার ইন্দ্রজাল!
কাকে ডাকি এই নিষ্ঠুর এপ্রিলে’
কবির কাব্যরস আস্বাধন করার প্রলোভন আমাকে সব সময়ই আটকে রাখে এইসব কবিতায়। কাব্য যখন শিল্প হয়ে ওঠে বারবার মনে হয় সেইসব জড়িয়ে থাক আমার শরীর, আমার চোখে আর আমার সংকল্পে। কবির প্রতি সব সবময় শুভকামনা।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com